ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পের আঘাতে দেশটির রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। স্থানীয় সময় বুধবার দেশটির উত্তর উপকূলের কাছে সন্ধ্যা ৬টার দিকে ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে দেশটিতে নেমে এসেছে চরম পরিস্থিতি।
ভূমিকম্পের তীব্রতায় অসংখ্য ঘরবাড়ি ও বহুতল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশ কিছু ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ আটকে আছেন। ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, ভয়াবহ এ ভূমিকম্পে ঘরবাড়িসহ মূলত সবই হারিয়েছে ভেনেজুয়েলার মানুষ। খবর আলজাজিরার।
স্থানীয় সংবাদিক নোশিস সোতো এ ঘটনার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, ভেনেজুয়েলায় সরকারি ছুটির দিন থাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্পটি যখন আঘাত হানে, তখন অনেকেই তাদের বাড়িতেই ছিলেন। আলজাজিরাকে সোতো বলেন, আমি বাড়িতেই ছিলাম, সাধারণ ছুটির দিনের মতোই আমরা বিশ্বকাপ খেলা দেখছিলাম, আর ঠিক তখনই আমরা এক তীব্র ঝাঁকুনি ও বিশাল ধাক্কা অনুভব করলাম। এরপর চারপাশে আমি শুধু ভাঙা কাচের টুকরোই দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার ভবনটি একদম মাঝখান থেকে ফেটে গেছে।
তিনি আরও বলেন, মানুষজন অ্যাপার্টমেন্ট ও তাদের ঘরবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিল। আমি শুধু এটাই বলতে পারি যে, আজ যা ঘটেছে তার জন্য আমরা মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। এটি অত্যন্ত একটি সংকটাপন্ন পরিস্থিতি। আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে আছি। আজ আমাদের সঙ্গে ঠিক কী ঘটে গেল, মানুষ এখনও তা বুঝতে ও মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি জানান, ভেনেজুয়েলায় সর্বশেষ ১৯৬০-এর দশকে ভূমিকম্প হয়েছিল, যার ফলে মানুষজন বুঝতে পারছিলেন না যে এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, আপনার মনে হবে পায়ের নিচের মাটি কাঁপছে এবং আমরা আদৌ বেঁচে ফিরতে পারব কি না তা নিয়ে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারবেন না। এটি যেকোনো মানুষের জন্যই এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। আমি কখনোই চাইব না এমন অভিজ্ঞতা অন্য কারও হোক।
দেশের ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এখনও স্পষ্ট নয় উল্লেখ করে সোতো বলেন, আমরা মাঠপর্যায়ের খুব বেশি তথ্য পাচ্ছি না, কারণ টেলিফোন লাইন ও ইন্টারনেটসহ সব ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। তবে আমরা যতটুকু তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছি, তা থেকে বোঝা যাচ্ছে পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি ভয়াবহ।
তিনি আরও যোগ করেন, মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে এবং মূলত সবকিছুই হারিয়ে বসেছে। ভূমিকম্পের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ৩৮ বছর বয়সি স্থানীয় প্রকৌশলী হেসুস আলেহান্দ্রো পিনা তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, আমি একটি সাত তলা ভবনের শীর্ষ তলায় ছিলাম। প্রায় এক মিনিট ধরে পুরো ভবনটি প্রচণ্ডভাবে কাঁপছিল। ঘরের ল্যাম্প, টেলিভিশন, দেয়ালের ছবিসহ সবকিছু ভেঙে নিচে পড়তে থাকে। এমনকি ভবনের মূল পিলার ও বিমগুলো থেকে বিকট শব্দ আসছিল।
পিনা আলজাজিরাকে জানান, ভূমিকম্প থামার পরপরই তিনি ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন। তিনি বলেন, সবাই রাস্তায়, চত্বরে, ভবনের নিচে, তাদের ঘরের বাইরে অবস্থান করছিল। মানুষকে বেশ সতর্ক ও আতঙ্কিত দেখাচ্ছিল। সেখানে অনেকেই আহত হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, এখন ইতিমধ্যে মাঝরাত হয়ে গেছে এবং সবাই এখনও জেগে আছেন, ৭-৮ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও ঘরের বাইরে অবস্থান করছেন, খবরের দিকে চোখ রাখছেন। তারা সতর্ক অবস্থায় আছেন কারণ বলা হচ্ছে, আরও আফটারশক হতে পারে।
এদিকে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ভূমিকম্পের সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনা করে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি পরিস্থিতিকে ‘প্রকৃত ট্র্যাজেডি’ বলে বর্ণনা করেছেন। ভেনেজুয়েলায় এই ভয়াবহ দুর্যোগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এই ভূমিকম্পকে ‘বিধ্বংসী’ উল্লেখ করে ভেনেজুয়েলাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ৭ দশমিক ২ মাত্রার প্রথম ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ক্যারিবীয় উপকূলীয় শহর মোরনের পশ্চিমাঞ্চলে। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল ২২ কিলোমিটার। অন্যদিকে দ্বিতীয় কম্পনটির কেন্দ্র ছিল মোরন শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং এর গভীরতা ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার।
তীব্র এই কম্পনে রাজধানী কারাকাসসহ পুরো দেশ কেঁপে ওঠে। এমনকি প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা পর্যন্ত এই কম্পন অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পের পর ২০টিরও বেশি আফটারশক অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পের প্রভাবে ভেনেজুয়েলায় অনেক ভবন ধসে পড়েছে। আতঙ্কিত বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাধারণ মানুষকে দ্রুত ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলা এমন একটি ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান এই দুটি টেকটোনিক প্লেট বা ভূ-গাঠনিক পাতের সংযোগস্থল রয়েছে। ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, আজকের দুটি ভূমিকম্পের মধ্যে দ্বিতীয় এবং অধিক শক্তিশালীটি এই পাতগুলোর সীমানার কাছাকাছি শ্যালো স্ট্রাইক-সিøপ ফল্টিংয়ের (অগভীর চ্যুতি) ফলে সৃষ্টি হয়।
পাতগুলোর মধ্যবর্তী ফাটল বা চ্যুতি যখন আনুভূমিকভাবে সরে যায়, তখনই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। আর এই সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি হঠাৎ দ্রুতগতিতে ঘটলে ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
মানচিত্রে ভূমিকম্পকে সাধারণত একটি বিন্দু দিয়ে চিহ্নিত করা হলেও এই মাত্রার কম্পনগুলো আসলে একটি বিশাল চ্যুতি এলাকাজুড়ে হওয়া ভূ-বিচ্যুতির ফল। সংস্থাটির মতে, এই জোড়া ভূমিকম্প সম্ভবত ভূ-অভ্যন্তরের ফাটলগুলোর মধ্যে কোনো জটিল পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ারই বহিঃপ্রকাশ।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলছে, শক্তিশালী ঝাঁকুনিসহ আরও ‘আফটারশক’ অনুভূত হওয়ার শঙ্কা এখনো রয়ে গেছে। ভূমিকম্পপ্রবণ ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ইতিহাসে ১৯৯৭ সালে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শক্তিশালী এক ভূমিকম্পে ৭৩ জন এবং ১৯৬৭ সালে কারাকাসে ভূমিকম্পে ২৩৬ জন নিহত হয়েছিলেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও