স্পেসএক্স যেন মহাকাশ প্রযুক্তির একক অধিপতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

গত ১২ জুন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্পেসএক্স ও এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক এক নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন। ন্যাসডাক

2026-06-25T23:46:04+00:00
2026-06-25T23:47:05+00:00
 
  শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬,
১২ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
স্পেসএক্স যেন মহাকাশ প্রযুক্তির একক অধিপতি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ১১:৪৬ পিএম  আপডেট: ২৫.০৬.২০২৬ ১১:৪৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
গত ১২ জুন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে স্পেসএক্স ও এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক এক নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন। ন্যাসডাক শেয়ারবাজারে ১৩৫ ডলার মূল্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) শুরুর পর দ্রুতই তা ১৫০ ডলারে উন্নীত হয়, যা কোম্পানিটির বাজারমূল্যকে এক দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যায়। এই সাফল্যে ইলন মাস্কের সম্পদের পরিমাণ এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যদিও ২৩ জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে যে, বাজারের অস্থিরতায় তিনি সাময়িকভাবে সেই ট্রিলিয়নিয়ার মর্যাদা হারিয়েছেন। খবর দ্য এজের। 

কিন্তু এই আর্থিক মাইলফলকের আড়ালে প্রযুক্তি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষকরা কোম্পানিটির ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। স্পেসএক্সের কর্মকাণ্ড ও এর ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে ১৭ থেকে ১৯ শতকের ব্রিটিশ, ডাচ বা ফরাসি ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো চার্টার্ড কোম্পানিগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

সার্বভৌম ক্ষমতার বাইরে স্পেসএক্স : ঐতিহাসিক চার্টার্ড কোম্পানিগুলো কেবল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং তারা মুদ্রা প্রচলন, পুলিশি নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধ পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয় চুক্তির মতো সার্বভৌম কাজও সম্পাদন করত। বিশ্লেষকদের মতে, স্পেসএক্স বর্তমান বিশ্বে ঠিক সেই ধারার একটি আধুনিক রূপান্তর। যদিও কোম্পানিটি সরাসরি কোনো রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করছে না, তবে মহাকাশ গবেষণায় তাদের একচেটিয়া আধিপত্য এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকারগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।

বর্তমানে মহাকাশে পণ্য প্রেরণের ক্ষেত্রে স্পেসএক্সের বৈশ্বিক বাজারের অংশীদারিত্ব প্রায় ৮০ শতাংশ। মার্কিন সরকারের নাসার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও এখন অনেকাংশেই স্পেসএক্সের ওপর নির্ভরশীল। স্টার লিংকের মাধ্যমে কক্ষপথের রেডিও স্পেকট্রাম এবং দুর্লভ স্লটগুলোর ওপর কোম্পানিটি যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, তা নতুন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর জন্য বাজারে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।

আইনি শূন্যতা ও নিয়মের নিয়ন্ত্রণ : ১৯৬৭ সালের আন্তর্জাতিক ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ বা মহাকাশ চুক্তিটি এমন একটি সময়ে তৈরি হয়েছিল যখন মহাকাশ কেবল সরকারগুলোর নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেখানে বেসরকারি কোম্পানির ক্ষমতা বা সম্পদ আহরণ নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। এই আইনি শূন্যতার সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে এবং পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে এমন কিছু আইন ও চুক্তি (আর্টেমিস অ্যাকর্ডস) করেছে, যা মহাকাশে সম্পদ আহরণকে বৈধতা দেয়। এতে স্পেসএক্সের মতো কোম্পানিগুলো নিজেদের সুবিধামতো নিয়ম তৈরির সুযোগ পাচ্ছে, যা অতীতে চার্টার্ড কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল।

রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব ও নির্ভরশীলতা : রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেসরকারি কোম্পানির প্রভাবের সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা গিয়েছিল ইউক্রেন যুদ্ধের সময়। রাশিয়ার নৌবহরের বিরুদ্ধে হামলায় সহায়তা করতে ক্রিমিয়ার আকাশে স্টারলিংক সেবা সক্রিয় করার বিষয়ে ইলন মাস্ক অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এটি কার্যত একজন ব্যক্তির একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সামরিক সিদ্ধান্তে ভেটো দেওয়ার মতো ঘটনা ছিল, যা মার্কিন সরকারও সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।


ইতিহাসবিদরা বলছেন, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যখন রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে, তখন সরকারের ক্ষমতা খর্ব হতে থাকে। অতীতে ব্রিটেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সিপাহি বিদ্রোহ বা দুর্ভিক্ষের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল। বর্তমান নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, স্পেসএক্সের মতো অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের নির্ভরতা কীভাবে কমানো যায়।

ভবিষ্যৎ করণীয় : বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রযুক্তি-নির্ভর প্রতিষ্ঠানের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হলে কেবল আইন করাই যথেষ্ট নয়। এর বদলে কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদে সরকারি প্রতিনিধি রাখা অথবা সরকারের কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে। এতে একদিকে যেমন খাতের উদ্ভাবনী উৎসাহ বজায় থাকবে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সরকারের তদারকিও নিশ্চিত হবে।

স্পেসএক্সের পুঁজিবাজারে পদার্পণ কেবল একটি ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, বরং এটি প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের সমীকরণ পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সময়মতো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে, এই ধরনের প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   মহাকাশ  প্রযুক্তি  অধিপতি  স্পেসএক্স 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: