মার্কিন অভিবাসন নীতিতে কট্টরপন্থা অবলম্বনের পক্ষে বড় ধরনের আইনি জয় পেলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মেক্সিকো সীমান্ত উপচে পড়া ভিড় সামাল দিতে না পারলে আশ্রয়প্রার্থী বা শরণার্থীদের ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে বলে রায় দিয়েছেন মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল বিচারকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ৬-৩ ভোটে এই ঐতিহাসিক রায় দেওয়া হয়।
এই রায়ের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের একটি পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে গেল, যেখানে বলা হয়েছিল যে ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতি মার্কিন ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় আইনের পরিপন্থী। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পূর্বসূরি ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন এই নীতি বাতিল করলেও, ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর তা পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়া শুরু করেন, যা ‘মিটারিং’ নীতি নামে পরিচিত।সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে অভিবাসন সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেওয়া হয়, যার দুটিই ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে গেছে।
মার্কিন আইন অনুযায়ী, কোনো অভিবাসী ‘যুক্তরাষ্ট্রে এসে পৌঁছালে’ তিনি আশ্রয়ের জন্য আবেদন করতে পারেন এবং ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তার মাধ্যমে তার আবেদন যাচাই হওয়া বাধ্যতামূলক। তবে এই মামলার মূল আইনি জটিলতা ছিল— যাদের মেক্সিকো সীমান্তের ওপারে আটকে দেওয়া হচ্ছে, তারা আদৌ যুক্তরাষ্ট্রে এসে পৌঁছেছেন কি না।
আদালতের রক্ষণশীল বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো রায়ের মূল বক্তব্য পাঠ করে বলেন, এর উত্তর হলো ‘না’। তিনি তার পর্যবেক্ষণে লেখেন, সাধারণ ভাষায় কেউ কোনো স্থানে (যেমন একটি বাড়ি, শহর বা দেশে) প্রবেশ করার আগে সেখানে ‘এসে পৌঁছেছেন’— এমনটা বলা যায় না। অভিবাসন আইনের ধারাগুলোর সাধারণ অর্থও এই যুক্তিকেই সমর্থন করে।
সুপ্রিম কোর্টের তিন উদারপন্থী বিচারক এই রায়ের তীব্র বিরোধিতা করে ভিন্নমত পোষণ করেন। উদারপন্থী বিচারপতি সোনিয়া সোটোমায়োর আদালত কক্ষে দীর্ঘ সময় নিয়ে তার ভিন্নমতের সারাংশ পাঠ করেন, যা সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে কোনো রায়ের প্রতি তীব্রতম বিরোধিতার প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়।
এর জবাবে রক্ষণশীল বিচারপতি আলিটো অত্যন্ত নজিরবিহীনভাবে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি আদালত কক্ষেই দাঁড়িয়ে বলেন, সোটোমায়োর তার ভিন্নমত এভাবে আদালতে প্রকাশ করবেন জানলে তিনি রায়ের মূল কপিতে আরও অনেক যুক্তি যোগ করতেন। দুই বিচারপতির এই প্রকাশ্য দ্বিমত মার্কিন বিচারিক অঙ্গনে বেশ চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।
আজকের দ্বিতীয় রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনকে আরও একটি বড় ছাড় দিয়েছে। এর ফলে প্রায় সাড়ে তিন লাখ হাইতিয়ান এবং ৬,১০০ সিরীয় শরণার্থীর মানবিক মর্যাদা বা ‘টেম্পোরারি প্রটেক্টেড স্ট্যাটাস’ বাতিল করে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পথ পরিষ্কার হলো।
২০১৬ সালে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে মেক্সিকো সীমান্তে অভিবাসীদের ঢল নামলে প্রথম এই ‘মিটারিং’ বা শরণার্থী ফিরিয়ে দেওয়ার প্রথার অনানুষ্ঠানিক সূত্রপাত হয়। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এটিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। ২০২১ সালে জো বাইডেন ক্ষমতায় এসে এটি বাতিল করেন।
বর্তমানে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর অভিবাসন নীতি আরও কঠোর করেছেন। মানবাধিকার সংগঠন ‘আল ওত্রো লাদো’ ২০১৭ সাল থেকে এই নীতির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছিল। ২০২৪ সালে সান ফ্রান্সিসকোর আপিল আদালত এই নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করলেও আজ সুপ্রিম কোর্ট সেই রায় উল্টে দিলেন। এর পাশাপাশি চলতি জুনের শেষের দিকে ট্রাম্পের অপর একটি বড় সিদ্ধান্ত— ‘জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব’ বাতিলের আইনি বৈধতা নিয়েও সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় আসার কথা রয়েছে।
সময়ের আলো/কহু