শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের পর এক চরম মানবিক ও বিপর্যয়কর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। রাজধানী কারাকাসসহ উপদ্রুত এলাকাগুলোতে এখনো চলছে ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারের আকুল আকুতি। তবে এই মাত্রার একটি প্রলয়ঙ্কারী প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ভেনেজুয়েলা যে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না, তা এখন স্পষ্ট। ধ্বংসস্তূপ সরানোর প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি না থাকায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট সেক্টর ও সাধারণ নাগরিকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার মানুষ। এখনো অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যোগাযোগ ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় মানুষ তাদের প্রিয়জনদের খোঁজ নিতে পারছেন না, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি ট্রাজিক ও আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। আফটারশক বা পুনরায় ভূমিকম্পের ভয়ে মানুষ ঘরে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। শহরের বিভিন্ন পাবলিক স্কয়ার বা উন্মুক্ত চত্বরে খোলা আকাশের নিচে ক্যাম্প করে রাত কাটাচ্ছেন হাজারো বাসিন্দা, যাদের পাহারায় রয়েছে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন। সাধারণ মানুষকে উপদ্রুতদের জন্য খাদ্য ও পানি নিয়ে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্প অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা। এর আগে ১৯৬৭ সালে দেশটির রাজধানীতে এমন বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। ফলে এই ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো আধুনিক সক্ষমতা বা পূর্বপ্রস্তুতি দেশটির উদ্ধারকারী দলগুলোর নেই।
এদিকে ভেনেজুয়েলার এই কঠিন সময়ে সাড়া দিয়ে বিশ্বের একাধিক পরাশক্তি ও উন্নত দেশ দ্রুত উদ্ধারকারী দল, কোটি কোটি টাকার অর্থ সাহায্য ও ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বাহরাইন থেকে এক বিবৃতিতে জানান, এই মুহূর্তে আমেরিকার প্রথম অগ্রাধিকার হলো ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধার করা। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন নাগরিকদের অনেক আত্মীয়-সংগঠনও রয়েছেন। মার্কিন প্রশাসন খুব ইতিবাচকভাবে এই সংকটে সাড়া দিচ্ছে এবং আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র বুঝে দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনে কাজ করবে। এছাড়া দেশটির ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে।
এছাড়া. ভেনেজুয়েলার অনুরোধ পাওয়া মাত্রই ‘সুইস রেসকিউ চেইন’-এর ৮০ জন দক্ষ উদ্ধারকর্মী, ৮টি বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর এবং ১৮ টন ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে সুইজারল্যান্ড সরকার।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সাথে ফোনে কথা বলে গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। ফ্রান্স ইতিমধ্যে ৮৫ জন অনুসন্ধান ও উদ্ধার বিশেষজ্ঞের একটি চৌকস দল পাঠিয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রেমলিনের এক বিবৃতিতে ভেনিজুয়েলার বন্ধুভাবাপন্ন জনগণের প্রতি গভীর সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং এই কঠিন সময়ে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
স্পেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের ‘ইমার্জেন্সি ইউনিট’-এর ৫৪ জন বিশেষ সেনা উদ্ধারকর্মী জিওফোন (ভূগর্ভস্থ শব্দ ধারণকারী যন্ত্র) ও উদ্ধারকারী ক্যামেরাসহ ভেনেজুয়েলা যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডস উদ্ধারকাজের জন্য ২০ লাখ ইউরো বরাদ্দ করেছে। এছাড়া চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী ভেনিজুয়েলার এই ট্র্যাজেডিতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে জরুরি মানবিক সহায়তা ও উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন।
সময়ের আলো/কহু