ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরের গান্দারবাল জেলায় এক নবদম্পতিকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। প্রেমিকা অন্য এক পুরুষকে বিয়ে করায় ক্ষুব্ধ হয়ে তার স্বামীকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর পরিকল্পনা করেন সাবেক প্রেমিক। এ জন্য নবদম্পতির বাড়ির ঠিকানায় বিপুল পরিমাণ মাদক পাঠান তিনি। এরপর পুলিশকেও মাদকের চালানটির বিষয়ে খবর দেন।
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, পুরো ঘটনাটিই ছিল ওই নববধূর স্বামীকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা। পরে সাবেক প্রেমিক তারিক আহমেদ সোফিকে গ্রেফতার করা হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে গান্দারবাল জেলায় একটি বড় মাদকের চালান পাঠানোর বিষয়ে গোপন তথ্য পায় পুলিশ। মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার থাকার কারণে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় তারা।
৮ আগস্ট পুলিশ জানতে পারে, জম্মু-কাশ্মিরের বাইরে থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে গান্দারবালে একটি মাদকের পার্সেল পাঠানো হয়েছে। পরে গান্দারবালের ডাকঘর থেকে পার্সেলটি জব্দ করা হয়।
ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে পার্সেলটি খুললে এর ভেতর থেকে প্রায় ৪ কেজি কোকেন, ৮০ গ্রাম গাঁজা এবং বিভিন্ন ধরনের সাইকোট্রপিক ড্রাগ পাওয়া যায়।
পার্সেলটি পাঠানো হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দূরের উত্তর প্রদেশের কানপুর থেকে।
পুলিশ পরে যে ঠিকানায় পার্সেলটি পাঠানো হয়েছিল, সেখানে গিয়ে জানতে পারে বাড়ির মালিক একজন সাধারণ পোলট্রি খামারি। তিনি কয়েক মাস আগেই বিয়ে করেছেন।
ওই ব্যক্তি পুলিশকে জানান, পার্সেলের ভেতরে মুরগির খাবার থাকার কথা ছিল। মাদকের বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না।
তদন্তের সময় ওই খামারি পুলিশকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তিনি জানান, চলতি বছরের শুরুতে সৌদি আরবের একটি নম্বর থেকে তার বর্তমান স্ত্রীকে ফোন করে তাকে বিয়ে না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছিল।
পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ওই নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তখন সামনে আসে তার সাবেক প্রেমিক তারিক আহমেদ সোফির নাম।
শ্রীনগরের জয়নাকোট এলাকার বাসিন্দা সোফি ওই নারীর সাবেক প্রেমিক। পুলিশ বলছে, সাবেক প্রেমিকার বিয়ে মেনে নিতে না পেরে তার স্বামীকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর পরিকল্পনা করেন তিনি।
পরে ৯ আগস্ট সোফিকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
কাশ্মির পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, তদন্তে তারা জানতে পারেন, সোফি সরাসরি মাদক পাঠাননি। কানপুরে থাকা তার বন্ধু আরিফের মাধ্যমে পার্সেলটি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তিনি।
পুলিশের দাবি, সোফি প্রথমে বন্ধুকে দিয়ে নবদম্পতির ঠিকানায় মাদকের পার্সেল পাঠান। এরপর পুলিশকে বিষয়টি জানানোর ব্যবস্থাও করেন। তবে যাতে তার ওপর সন্দেহ না পড়ে, সে জন্য সরাসরি পুলিশকে ফোন না করে অন্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে তথ্যটি পৌঁছে দেন।
জিজ্ঞাসাবাদে সোফি পুলিশকে এ বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে তদন্তকারীরা।
পুলিশের কাছে ওই খামারি জানান, পার্সেল পাঠানোর আগে প্রেরক হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল, পোলট্রি ফিডের নমুনা পাঠানো হবে।
এই কথায় বিশ্বাস করেই পার্সেলটি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। পরে সেটির ভেতর থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার হয়।
পুলিশ ওই যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত নম্বর পরীক্ষা করে জানতে পারে, সেটি সৌদি আরবের একটি মোবাইল নম্বর।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, আগে সৌদি নম্বর থেকে ওই নারীর বিয়ের বিরুদ্ধে হুমকি এবং পরে একই ধরনের নম্বর ব্যবহার করে মাদকের পার্সেল পাঠানোর মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে।
এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এই তথ্য পাওয়ার পর তদন্তের গতিপথ বদলে যায়। তখন তারা ওই খামারিকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর পরিকল্পনার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, সোফির বন্ধু আরিফ কানপুরের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে সৌদি আরবে থাকেন। মাদকের পার্সেল কীভাবে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন এবং পুরো পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি কতটা জানতেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সোফির বিরুদ্ধে ভারতের নারকোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস (এনডিপিএস) আইনের ৮/২০ ও ২১ ধারায় মামলা করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, মাদকের এই চালানের সঙ্গে আর কারা জড়িত এবং নবদম্পতির বাড়িতে মাদক পাঠানোর পুরো পরিকল্পনায় আরিফের ভূমিকা কতটা ছিল।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, সাবেক প্রেমিকার বিয়ে মেনে নিতে না পেরে তার স্বামীকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর জন্যই এই অদ্ভুত ষড়যন্ত্র করেছিলেন সোফি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ