ভারতের গুপ্তচর সংস্থা ‘র’ কীভাবে কাজ করে, নিয়োগের প্রক্রিয়া কী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬৫ সালের ২২ দিনের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে। কোনো পক্ষই সরাসরি বিজয় দাবি করতে পারেনি।

2026-08-11T18:06:07+00:00
2026-08-11T18:17:32+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬,
২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ভারতের গুপ্তচর সংস্থা ‘র’ কীভাবে কাজ করে, নিয়োগের প্রক্রিয়া কী?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬, ৬:০৬ পিএম  আপডেট: ১১.০৮.২০২৬ ৬:১৭ পিএম
ভারতের গুপ্তচর সংস্থা ‘র’। সংগৃহীত ছবি
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬৫ সালের ২২ দিনের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে। কোনো পক্ষই সরাসরি বিজয় দাবি করতে পারেনি। তবে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ভারতের সামনে একটি বড় দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছিল— পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা ও অস্ত্রভাণ্ডার সম্পর্কে তাদের কাছে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য ছিল না।

যুদ্ধবিরতি যখন ২২ সেপ্টেম্বর কার্যকর হয়, তখন পাকিস্তানের অস্ত্রভাণ্ডার প্রায় শেষের দিকে। নতুন করে অস্ত্র এনে মজুত করাও সহজ ছিল না। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের কাছে অস্ত্র বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।  

কিন্তু যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানের এই দুর্বল অবস্থার সঠিক চিত্র ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের কাছে স্পষ্ট ছিল না। সাবেক ‘র’ প্রধান শঙ্করণ নায়ার তার বই ইনসাইড আইবি অ্যান্ড র: দ্য রোলিং স্টোন দ্যাট গ্যাদার্ড মস-এ সে সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরেছেন।

তার বর্ণনা অনুযায়ী, তৎকালীন ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল জে এন চৌধুরী প্রতিরক্ষামন্ত্রী যশবন্তরাও চৌহানকে জানিয়েছিলেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল পর্যাপ্ত গোয়েন্দা তথ্যের অভাব।  

এই অভিজ্ঞতার পরই ভারতের সামনে দেশের বাইরের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য আলাদা একটি সংস্থা গঠনের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। সেই প্রক্রিয়ার ফলেই ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং, সংক্ষেপে ‘র’।

যেভাবে যাত্রা শুরু করে ‘র’

১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘র’ যাত্রা শুরু করে। সংস্থাটির প্রথম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান রামেশ্বর নাথ কাও বা আর এন কাও। তার সঙ্গে শঙ্করণ নায়ারও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। 

শুরুতে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি) থেকে প্রায় ২৫০ জন কর্মকর্তাকে নতুন সংস্থাটিতে বদলি করা হয়। পরবর্তী সময়ে ‘র’-এর জন্য নতুন লোক বাছাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেও।

তবে সেই সরাসরি নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে পরে নানা প্রশ্ন ওঠে। কারণ, সংস্থায় কর্মরত ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের মধ্য থেকেও অনেকে চাকরি পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ ছিল। এ কারণে সে সময় রসিকতা করে ‘র’-কে ‘রিলেটেড অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ও বলা হতো।

১৯৭৩ সালের পর সেই নিয়োগব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। প্রার্থীদের জন্য চালু হয় একাধিক ধাপের পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকার। বাছাই প্রক্রিয়াও হয়ে ওঠে অনেক বেশি কঠোর।

‘র’-এ নিয়োগের প্রক্রিয়া কেমন? 

‘র’-এর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সাবেক কর্মকর্তা ও গবেষকদের লেখায় নানা তথ্য উঠে এসেছে। নীতিন গোখলে তার আরএন কাও, জেন্টলম্যানস স্পাইমাস্টার বইয়ে এমন একটি বাছাই প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। 

তার বর্ণনা অনুযায়ী, প্রার্থীদের প্রথমে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হতো। কখনো তাদের গভীর রাতে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হতে বলা হতো। সেখানে নেওয়া হতো অবজেক্টিভ ধরনের পরীক্ষা। যারা সেটি পেরোতেন, তাদের পরবর্তী ধাপে সাক্ষাৎকার দিতে হতো। 

১৯৭৩ সালে ‘র’-এ যোগ দেওয়া জয়দেব রানাডের অভিজ্ঞতাও ছিল প্রায় একই রকম। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপের পর সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সাক্ষাৎকার নেন। এরপর তাকে মুখোমুখি হতে হয় আরও উচ্চপর্যায়ের একটি বোর্ডের।  

সেই বোর্ডে ছিলেন পররাষ্ট্র সচিব, ‘র’-এর প্রধান আর এন কাও, একজন মনোবিজ্ঞানীসহ ছয়জন সদস্য। তার সাক্ষাৎকার চলে প্রায় ৪৫ মিনিট। 

দুই মাস পর রানাডে জানতে পারেন, তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। একই সময়ে প্রতাপ হেবলিকর, চক্রু সিনহা ও বিধান রাওয়ালও নির্বাচিত হন।

সাবেক বিশেষ সচিব রানা ব্যানার্জীর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যেও বিশেষভাবে কিছু কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়েছিল। পরে কোনো একপর্যায়ে সেই ধরনের নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। 

এখন কোথা থেকে কর্মকর্তা নেয় ‘র’?

বর্তমানে ‘র’-এর কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ ভারতীয় পুলিশ সার্ভিস বা আইপিএস থেকে আসেন বলে সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে জানা যায়। অর্থনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য কাস্টমস ও আয়কর বিভাগের কর্মকর্তাদেরও নেওয়া হতে পারে। তবে এই পদ্ধতি নিয়ে ‘র’-এর সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যেই ভিন্নমত রয়েছে।

সাবেক ‘র’ প্রধান বিক্রম সুদ তার দ্য আনএন্ডিং গেম বইয়ে লিখেছেন, একজন আইপিএস কর্মকর্তা হতে হতে সাধারণত বয়স প্রায় ২৭ বছরে পৌঁছে যায়। এরপর কয়েক বছর পর ‘র’-এ যোগ দিলে তার বয়স ৩০ বা তার বেশি হতে পারে।  

তার মতে, এই বয়সে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের পেশায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে। গোয়েন্দা পেশায় প্রয়োজন এমন কিছু দক্ষতা, যা পুলিশি চাকরির প্রশিক্ষণে সবসময় তৈরি হয় না। 

ভাষা শেখা, মানুষের কাছ থেকে তথ্য বের করে আনা, অর্থনীতি, সাইবার প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও কৌশলগত বিষয়ে দক্ষতা— আধুনিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার জন্য এসবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। 

প্রশিক্ষণে কী শেখানো হয়?

‘র’-এর জন্য নির্বাচিত কর্মকর্তাদের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজে প্রস্তুত করতে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। 

এর মধ্যে বিদেশি ভাষা শেখানোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদেশে কাজ করতে হলে শুধু ভাষা জানা নয়, সংশ্লিষ্ট দেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের আচরণ বোঝাও প্রয়োজন।

ফিল্ড পর্যায়ের প্রশিক্ষণে কঠিন আবহাওয়ায় কাজ করা, অপরিচিত পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজের পরিচয় ও দায়িত্ব গোপন রাখতে হবে— এসব বিষয়ও শেখানো হয় বলে সাবেক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। 

আত্মরক্ষার জন্য মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের কথাও বিভিন্ন বইয়ে এসেছে। এর মধ্যে ‘ক্রাভ মাগা’র নাম উল্লেখ করা হয়। 

আগে গোপন যোগাযোগের কিছু পুরোনো পদ্ধতিও ব্যবহার করা হতো। যেমন ‘ডেড লেটার বক্স’। এ পদ্ধতিতে দুজনের সরাসরি দেখা না করেও নির্দিষ্ট স্থানে কোনো বার্তা রেখে তা অন্য ব্যক্তির মাধ্যমে সংগ্রহ করা সম্ভব হতো। সাংকেতিকভাবে তথ্য লেখার পদ্ধতিও প্রশিক্ষণের অংশ ছিল বলে সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে জানা যায়।


বিদেশে কীভাবে কাজ করেন ‘র’-এর কর্মকর্তারা? 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মতো ভারতও বিদেশে তার কূটনৈতিক মিশনকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। 

‘র’-এর কর্মকর্তাদের অনেক সময় ভারতীয় দূতাবাস বা কনস্যুলেটে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। সেখানে তাদের প্রকাশ্য পরিচয় অন্য সরকারি কর্মকর্তার মতো হলেও প্রকৃত দায়িত্ব গোপন রাখা হয়।

কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন নাম ও পরিচয় ব্যবহার করার কথাও বিভিন্ন বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিক যতীশ যাদব তার র: এ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়াস কভার্ট অপারেশনস বইয়ে এমন একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ‘র’-এর এক কর্মকর্তা বিক্রম সিংকে মস্কোতে যাওয়ার সময় ‘বিশাল পণ্ডিত’ নাম ব্যবহার করতে হয়েছিল। এমনকি পরিবারের সদস্যদের পরিচয়ও বদলে দেওয়া হয়েছিল বলে বইটিতে দাবি করা হয়েছে।  

পরিচয় ফাঁস হলে কী হয়? 

গোয়েন্দা পেশার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো নিজের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়া। যতই সতর্কতা নেওয়া হোক, বিদেশে কাজ করার সময় সন্দেহের মুখে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

পরিচয় প্রকাশ পেলে একজন কর্মকর্তাকে দ্রুত সেই দেশ ছাড়তে হতে পারে। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কূটনৈতিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ, সবকিছু।

সাবেক ‘র’ কর্মকর্তা রানা ব্যানার্জী ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিষয়ে একটি কূটনৈতিক ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, দুই দেশই একে অপরের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলে। কোনো কর্মকর্তা সীমা অতিক্রম করলে তাকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে পারে।

একজন কর্মকর্তার জন্য পরিস্থিতিটি কতটা কঠিন হতে পারে, তার একটি বাস্তব দিকও তুলে ধরেছেন ব্যানার্জী। কেউ যদি তিন বছরের জন্য বিদেশে দায়িত্ব পান, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের জীবনযাপন— সবকিছু পরিকল্পনা করে নিতে হয়। কিন্তু হঠাৎ করে ছয় মাসের মধ্যেই দেশ ছাড়ার নির্দেশ এলে পুরো পরিবারকেই অপ্রস্তুত অবস্থায় ফিরে আসতে হতে পারে।

এই বাস্তবতাই দেখায়, গোয়েন্দা পেশা শুধু রহস্য, রোমাঞ্চ কিংবা গোপন অভিযানের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধরনের ত্যাগের প্রয়োজন। দেশের নিরাপত্তার জন্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের এই কাজের আড়ালে তাই কর্মকর্তাদের জীবনে অনেক অদৃশ্য ঝুঁকিও থেকে যায়।


সময়ের আলো/ইউএমএইচ



  বিষয়:   ভারতের গুপ্তচর সংস্থাম   


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: