তাইওয়ানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীনের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ানোর চেয়ে বরং সরাসরি সংলাপ ও যোগাযোগ বাড়ানোই বেশি কার্যকর— এমনটাই মনে করেন দেশটির প্রধান বিরোধী দল কুওমিনতাং (কেএমটি)-এর নেত্রী চেং লি-ওয়েন।
তবে চেংয়ের এই অবস্থান তার রাজনৈতিক অতীতের সঙ্গে বেশ বৈপরীত্যপূর্ণ। কারণ তরুণ বয়সে তিনিই ছিলেন তাইওয়ানের স্বাধীনতাপন্থী আন্দোলনের অন্যতম সোচ্চার কণ্ঠ। একসময় কুওমিনতাংকে তিনি তাইওয়ানের জন্য ‘ঘৃণ্য শাসকগোষ্ঠী’ বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে সেই অবস্থান বদলে এখন তিনিই কেএমটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পক্ষে কথা বলছেন।
তাইওয়ের রাজধানী তাইপেতে কেএমটির কার্যালয়ে বসে টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চেং বলেন, তাইওয়ান প্রণালিকে সামরিক সংঘাতের সীমারেখা হিসেবে না দেখে শান্তির সেতু হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক
চেংয়ের রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে চলতি বছরের এপ্রিলে। সে সময় তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বেইজিংয়ে বৈঠক করেন। এক দশকের মধ্যে এটিই ছিল কেএমটির কোনো নেতার চীনে এমন গুরুত্বপূর্ণ সফর।
চেং জানান, বৈঠকের আগে শি জিনপিং কী ধরনের আচরণ করবেন তা নিয়ে খুব বেশি প্রত্যাশা ছিল না। কিন্তু বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে যে ইতিবাচক মনোভাব ও সৌহার্দ্য তিনি পেয়েছেন, তা তাকে অবাক করেছে।
চেংয়ের দাবি, শি তাকে যুদ্ধের পরিবর্তে সম্পর্ক উন্নয়ন ও শান্তির বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন।
তার ভাষায়, তাইওয়ান প্রণালির দুই তীরের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে হলে পুরোনো ‘স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতা’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি চান না, পূর্ব এশিয়ার এই অঞ্চলকে সামরিক সংঘাতের সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে দেখা হোক।
চীন নিয়ে তাইওয়ানে বিভক্ত রাজনীতি
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করা হবে, তা নিয়ে তাইওয়ানের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই মতবিরোধ রয়েছে।
ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (ডিপিপি) মনে করে, চীনের চাপ মোকাবিলায় তাইওয়ানকে নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বেইজিংয়ের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমাতে হবে। এ কারণেই তারা এশিয়ার অন্যান্য দেশ ও পশ্চিমা অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে কেএমটির একটি বড় অংশ মনে করে, চীনের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দিলে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। তাদের মতে, সামরিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনার দরজাও খোলা রাখা দরকার।
চেংয়ের অবস্থান আরও এক ধাপ এগিয়ে। তিনি মনে করেন, চীনের সঙ্গে কথা বলা মানেই তাইওয়ানের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া নয়।
‘চীনের সঙ্গে একীভূত হতে চাই না’
চেং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে থাকলেও তাইওয়ানকে দ্রুত চীনের সঙ্গে একীভূত করার কোনো পরিকল্পনার কথা বলেননি।
তিনি ‘১৯৯২ আদমশুমারী’-এর ভিত্তিতে দুই পক্ষের মধ্যে স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলেন। তবে তাইওয়ানের বর্তমান অবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন।
চীনের সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিষয়ে গণভোট আয়োজন করা হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে চেং বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনো তাড়া নেই। এত বড় সিদ্ধান্ত নিতে হলে তাইওয়ানের জনগণের মতামত ও স্বার্থকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।
অর্থাৎ তার কৌশল হলো— চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো, কিন্তু তাইওয়ানের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা।
চেংকে নিয়ে সমালোচনাও কম নয়
তবে চেংয়ের এই নীতিকে সবাই ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। ক্ষমতাসীন ডিপিপির নেতারা মনে করেন, চীন সামরিক চাপের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও তথ্যগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমেও তাইওয়ানকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
ডিপিপি আইনপ্রণেতা পুমা শেন চেংয়ের শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের সমালোচনা করে বলেছেন, চীনই এমন একটি দেশ, যারা তাইওয়ানকে দখলের হুমকি দিয়ে আসছে। তার মতে, সামরিক চাপের পাশাপাশি চীন ‘গ্রে-জোন’ কৌশলও ব্যবহার করছে।
চেংয়ের কেএমটি নেতৃত্বে আসার পেছনে চীনের তথ্যযুদ্ধ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব ছিল— এমন অভিযোগও রয়েছে। সমালোচকদের দাবি, চেংকে সমর্থন করে হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক ইউটিউব চ্যানেল সক্রিয় হয়েছিল।
তবে চেং এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। নিজেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কোনো ‘কাঠপুতলি’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হাস্যকর বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
তাইওয়ানিরা আসলে কী চান?
চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তাইওয়ানের সাধারণ মানুষের মনোভাবও বেশ জটিল।
একদিকে, গত দুই দশকে চীনের সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিরোধিতা করা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনা ও যুদ্ধের আশঙ্কা মানুষের মধ্যে ক্লান্তিও তৈরি করছে।
ফলে অনেক তাইওয়ানি এমন একটি মধ্যপন্থা চান, যেখানে চীনের সঙ্গে যুদ্ধও হবে না, আবার চীনের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে একীভূতও হতে হবে না।
চীন-তাইওয়ান সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ রায়ান হাস এই অবস্থানকে অনেকটা ‘গোল্ডিলকস’ নীতির সঙ্গে তুলনা করেছেন— অর্থাৎ সম্পর্ক যেন খুব উত্তপ্তও না হয়, আবার এতটা ঘনিষ্ঠও না হয় যে তাইওয়ানের নিজস্ব অবস্থান হুমকির মুখে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র নিয়েও চেংয়ের ভাবনা
তাইওয়ানের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে এবং সম্ভাব্য চীনা হামলা মোকাবেলায় দ্বীপটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
তবে চেং মনে করেন, তাইওয়ানের নিরাপত্তা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। তার লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও যোগাযোগের পথ খোলা রাখা।
তিনি জুনে যুক্তরাষ্ট্র সফরও করেন। তবে সেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়নি। সফরের সময় তার কিছু মন্তব্য নিয়েও সমালোচনা হয়।
চেংয়ের যুক্তি, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ যে শান্তির সম্ভাবনা যাচাই করতে বেইজিং সফর করাই তার কাছে বেশি জরুরি ছিল।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— চীন কতটা ছাড় দেবে?
চেংয়ের নীতির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বেইজিংয়ের অবস্থান।
চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের পথ খোলা রেখেছে। ফলে চীনের সঙ্গে সংলাপ শুরু করার পর বেইজিং যদি শুধু অর্থনৈতিক বা মানবিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক ছাড় দাবি করে, তখন চেংয়ের নীতি কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞ রায়ান হাসের আশঙ্কা, চীন হয়তো কেএমটি যতটা ধীরে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাইবে, তার চেয়ে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। আর দুই পক্ষের প্রত্যাশার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হলে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিতে পারে।
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক গুরুত্বও বিশাল
তাইওয়ান শুধু ভূরাজনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ উৎপাদনের বড় একটি অংশ এই দ্বীপে তৈরি হয়। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক চিপ উৎপাদনে তাইওয়ানের গুরুত্ব অপরিসীম।
এ কারণেই তাইওয়ানকে অনেক সময় বিশ্বের ‘সিলিকন শিল্ড’ বলা হয়। কারণ সেখানে থাকা উন্নত চিপ কারখানাগুলোকে ঘিরে সংঘাত হলে শুধু তাইওয়ান নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থা বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।
চেং চীনের সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ানোরও বিরোধিতা করেছেন। তাইওয়ানের সরকারের প্রস্তাবিত বড় প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়েও KMT আপত্তি জানিয়েছে। তবে চেং বলেছেন, জাতীয় প্রতিরক্ষা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিষয় সংসদে পর্যালোচনা করা হবে।
সামনে কী হতে পারে?
চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের সম্পর্ক এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সামরিক শক্তি, কূটনীতি, অর্থনীতি ও জনমত সবকিছু একসঙ্গে কাজ করছে।
চেং লি-ওয়েন মনে করেন, চীনের সঙ্গে কথা বলার পথ বন্ধ করে দিলে যুদ্ধের ঝুঁকি কমবে না। বরং সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করাই উত্তেজনা কমানোর বাস্তব উপায়।
অন্যদিকে তার সমালোচকেরা মনে করেন, চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা শেষ পর্যন্ত তাইওয়ানের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।
তাই চেংয়ের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ একটাই— চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা, কিন্তু সেই সম্পর্কের বিনিময়ে তাইওয়ানের স্বায়ত্তশাসন ও জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে কোনো আপস না করা।
চেং নিজেও স্বীকার করেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত আস্থা এখনো তৈরি হয়নি। তার মতে, দুই পক্ষের মধ্যে বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয় না; ধীরে ধীরে তা গড়ে তুলতে হয়।
আর তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার রাজনৈতিক দর্শনের মূল কথাটিও সেখানেই— চীনের সঙ্গে কথা বলা আত্মসমর্পণ নয়, বরং যুদ্ধ ঠেকানোর একটি সম্ভাব্য পথ।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ