গাজা ভূখণ্ডে চলমান গণহত্যা ও নৃশংসতায় ফিলিস্তিনি শিশুদের কোনো ‘অপ্রত্যাশিত বা আকস্মিক শিকার’ নয়, বরং ইসরাইলি বাহিনী সুনির্দিষ্ট ছক কষে তাদের মূল লক্ষ্যবস্তু (টার্গেট) বানিয়েছিল। ফিলিস্তিন ও ইসরাইল বিষয়ক জাতিসংঘের সর্বোচ্চ স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই অকাট্য ও শিউরে ওঠার মতো সিদ্ধান্ত টেনেছে।
চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত ৮৮ পৃষ্ঠার এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত শিশুদের ওপর চালানো ইসরাইলি বর্বরতার পুরো চিত্র উঠে এসেছে। স্নাইপার ও ড্রোন দিয়ে নিখুঁত নিশানা থেকে শুরু করে বন্দিশালায় অমানুষিক নির্যাতন, প্রজনন হিংস্রতা এবং স্কুল-হাসপাতাল ধ্বংসের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে এতে।
জাতিসংঘের এই বিশেষ তদন্ত কমিশনের প্রধান, ভারতের প্রখ্যাত আইনজীবী ও সাবেক বিচারপতি শ্রীনিবাসন মুরালিধর বেইজিং ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, প্রমাণাদি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী ফিলিস্তিনি শিশুদের সুনির্দিষ্টভাবে নিশানা করে হত্যা করেছে। এমনকি গত ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হওয়ার পরও শিশুদের হত্যা ও গুরুতর আহত করার সিলসিলা থামেনি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শিশুদের যে সুরক্ষা পাওয়ার কথা, ইসরাইল তা পুরোপুরি তোয়াক্কা করছে না।
কমিশনের মতে, ইসরাইল শিশুদের দুইভাবে ধ্বংস করছে— প্রথমত, কোয়াডকপ্টার (ড্রোন) ও স্নাইপার রাইফেল দিয়ে সরাসরি নিখুঁত নিশানায় গুলি করে; দ্বিতীয়ত, গাজা থেকে জীবনধারণের সব মৌলিক উপাদান (খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা) পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে।
তদন্তে দেখা গেছে, গত দুই বছরে ইসরাইলি হামলায় কমপক্ষে ২০ হাজার ১৭৯ জন শিশু নিহত এবং ৪৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছে— যা মোট হতাহতের এক-তৃতীয়াংশ। নিহতদের মধ্যে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যাই ৫ হাজার ৩১ জন, যার মধ্যে ১ হাজার ২৯ জন এক বছরের কম বয়সী এবং ৪২০ জন নবজাতক। এছাড়া আরও অন্তত ৫ হাজার ১৬০টি শিশু ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে নিখোঁজ রয়েছে।
গাজায় দায়িত্ব পালন করা ১৭ জন আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ কমিশনকে জানিয়েছেন, তারা অসংখ্য শিশুর মাথায় বা শরীরের উপরিভাগে একটি মাত্র গুলির ক্ষত পেয়েছেন। এক চিকিৎসক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেখে মনে হচ্ছিল ইসরাইলি সেনারা কিশোর ও শিশুদের নিশানা বানিয়ে গুলি করার এক নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি ৫ বছরের শিশু হিন্দ রজব ও তার পরিবারের ৬ সদস্যকে কারাকাস বা গাজা সিটির তাল আল-হাওয়া এলাকায় ইসরাইলের ১৬২তম ডিভিশনের ৪০১তম ব্রিগেড নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। তাদের উদ্ধারে যাওয়া রেড ক্রিসেন্টের অ্যাম্বুলেন্সটির ওপরও বোমা বর্ষণ করা হয়। এছাড়া ২০২৪ সালের ১২ এপ্রিল নুসেইরাত ক্যাম্পে তাঁবুর ভেতর মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার সময় মাত্র ১০ দিন বয়সী এক নবজাতক শিশুকে মাথায় গুলি করে এক ইসরাইলি ড্রোন (কোয়াডকপ্টার) চালক। শিশুটি অলৌকিকভাবে বাঁচলেও এখন প্রতিনিয়ত মৃগী রোগে ভুগছে।
এমনকি ২০২৫ সালের মে মাস থেকে গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের ত্রাণবাহী ট্রাকের সামনে খাবার নিতে আসা শিশুদের ওপরও গুলি চালানো হয়েছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী চালক জানান, খাবার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় দুই কিশোরকে মাথায় গুলি করতে দেখেছেন তিনি, এবং পাশে থাকা এক সেনা মন্তব্য করেছিল— ‘আমাদের আঙুল ট্রিগারেই থাকে’। ২০২৫ সালের নভেম্বরে যুদ্ধবিরতি লাইনের কাছে বাবার জন্য কাঠ কুড়াতে যাওয়া দুই ভাইকে ড্রোন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র মেরে হত্যা করে ইসরাইলি ‘কফির ব্রিগেড’।
শুধু গাজা নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীর বা ওয়েস্ট ব্যাংকেও ইসরাইলি বাহিনী ২১৩ জন ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করেছে। কমিশন জানিয়েছে, সেখানে ছেলেদের ‘ভবিষ্যতের সন্ত্রাসী’ তকমা দিয়ে বেছে বেছে টার্গেট করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তুলকর্মে ১০ বছরের এক নিরস্ত্র শিশুকে গুলি করার পর তার বাবাকে এক ইসরাইলি সেনা অহংকার করে বলে, ‘আমিই তোর ছেলেকে গুলি করেছি। খোদার কসম, ও মরে যাবে।’ শিশুটি পরে হাসপাতালে মারা যায়। অন্য এক ঘটনায় ১৪ বছরের এক কিশোরকে গুলি করে ৪৫ মিনিট রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয় এবং তার লাশের পাশে পাথর রেখে সে পাথর ছুড়ছিল বলে মিথ্যা নাটক সাজানোর ভিডিও ধারণ করে এক সেনা।
২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৬৫৫ জনের বেশি শিশুকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশন’-এ বন্দী। কারাগারের ভেতরে শিশুদের ওপর হিংস্র কুকুর লেলিয়ে দেওয়া, সুই ফুটিয়ে ইলেকট্রিক শক দেওয়া এবং খাবার-পানি না দিয়ে টানা ১২ ঘণ্টা কষ্টদায়ক পজিশনে দাঁড় করিয়ে রাখার প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। এমনকি সেদ তেইমান ও মেগিদ্দো কারাগারে বন্দি কিশোরদের ওপর পদ্ধতিগতভাবে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধের সাক্ষ্য মিলেছে। ২০২৫ সালের মার্চে এক ১৭ বছরের কিশোর মেগিদ্দো কারাগারে তীব্র অপুষ্টিতে ভুগে মারা যায়।
প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, গাজার ১৭৮টি ইনকিউবেটরের (নবজাতক সুরক্ষার যন্ত্র) মধ্যে মাত্র ৫৪টি অবশিষ্ট রেখেছে ইসরাইল। আল-নাসের শিশু হাসপাতালে বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দিয়ে স্টাফদের মাত্র ৩০ মিনিটে বের করে দেওয়া হয়। যুদ্ধবিরতির পর সেখানে গিয়ে দেখা যায়, লাইফ সাপোর্ট বন্ধ হয়ে ৪টি নবজাতকের মরদেহ ইনকিউবেটরের ভেতরেই পচে কঙ্কাল হয়ে গেছে। কৃত্রিম অবরোধের কারণে গাজায় গর্ভপাতের হার ৩০০ শতাংশ বেড়েছে।
গাজার ৯৭ শতাংশ স্কুল ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করা হয়েছে। ইসরাইলি সেনারা স্কুল ভবন ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে আনন্দ উল্লাস করেছে। এক ভিডিওতে এক সেনাকে বলতে শোনা যায়— ‘ছোটবেলায় সবসময় নিজের স্কুল উড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, আজ সত্যিই একটা স্কুল ওড়াচ্ছি। ওয়াও!’
জাতিসংঘের এই কমিশন তাদের আইনি পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট জানিয়েছে, ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী গাজায় সরাসরি ‘গণহত্যা’ এবং ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ সংঘটন করে চলেছে। শিশুদের ওপর এই পরিকল্পিত আক্রমণই প্রমাণ করে যে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে বংশপরম্পরায় বিলুপ্ত করার স্পষ্ট ‘জেনোসাইডাল ইনটেন্ট’ বা উদ্দেশ্য ইসরাইলের রয়েছে।
প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধী ইসরাইলি সামরিক ইউনিটগুলোর নাম উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে শিশুদের বিরুদ্ধে হওয়া এই যুদ্ধাপরাধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত গ্রেফতারি পরোয়ানা ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, এই তদন্তের বিষয়ে জাতিসংঘের কোনো অনুরোধ বা তথ্যের জবাব দেয়নি ইসরাইল প্রশাসন।
সময়ের আলো/কহু