দুই দফার শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে ভেনেজুয়েলায় নিহতে বেড়ে ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ। দেশটির ভঙ্গুর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় ধেয়ে আসায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় এগিয়ে এসেছে প্রতিবেশী দেশগুলো।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার (২৬ জুন) রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হতাহতের এই সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্লোস আলভারাদো।
এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত আমরা প্রায় ২৩৫ জন এমন রোগী পেয়েছি, যারা আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছেন অথবা আসার পরপরই প্রাণ হারিয়েছেন।’
আলভারাদো আরও বলেন, হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির সিংহভাগই রেকর্ড করা হয়েছে দেশটির উত্তরের উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরায়া। ভূকম্পনে এই অঞ্চলটি সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপর্যস্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় হাসপাতালগুলো ইতিমধ্যেই রোগীতে পূর্ণ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল যুক্ত করেছি।’
স্থানীয় সূত্র বলছে, লা গুয়াইরার মূল হাসপাতালটি ভূমিকম্পে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চিকিৎসকদের খোলা রাস্তায় বা ফুটপাতে রেখেই আহতদের জরুরি চিকিৎসা সেবা দিতে হচ্ছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে ওই অঞ্চলে বর্তমানে সব ধরনের টেলিফোন ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা বন্ধ রয়েছে।
এদিকে ভেনেজুয়েলার এই সংকটে আন্তর্জাতিক উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়েছে। প্রতিবেশী কলম্বিয়া সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের জাতীয় লজিস্টিক সেন্টার থেকে একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, ৬২ জনেরও বেশি উদ্ধারকর্মী ও বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী কুকুর নিয়ে প্রথম ফ্লাইটটি শুক্রবার ভোরেই ভেনেজুয়েলার উদ্দেশ্যে রওনা হবে। পরবর্তীতে ওই দিনই দ্বিতীয় আরেকটি ফ্লাইটে ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম ও কারিগরি সামগ্রী পাঠানো হবে। দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনায় এই দলটিকেও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যে পাঠানো হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর এই সমন্বিত আন্তর্জাতিক সহায়তা কেবল তাৎক্ষণিক জীবন বাঁচাতেই নয়, বরং হাজার হাজার আহতের চিকিৎসা ও মানবিক প্রয়োজন মেটাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় ভেনেজুয়েলাকে এমন এক সময়ে আঘাত করল, যখন দেশটি ইতিমধ্যেই দেড় দশক ধরে তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভূমিকম্পের আগে থেকেই দেশটিতে নিয়মিত ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিং চলছিল। বিগত ১৫ বছরের অর্থনৈতিক পতনের ফলে দেশটির পানি, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসহ অধিকাংশ জনসেবামূলক খাতগুলো ভেঙে পড়েছে। অনেক হাসপাতাল প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জামের অভাবে আগে থেকেই তাদের স্বাভাবিক সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম সেবা দিচ্ছিল।
এর ওপর, গত ১৫ বছরে উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানের খোঁজে অন্তত ৮০ লাখ মানুষ ভেনিজুয়েলা ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। গণহারে দেশত্যাগের এই তালিকায় বিপুল সংখ্যক পেশাজীবী থাকায়, এই মুহূর্তে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রকৌশলী ও চিকিৎসকের তীব্র সংকটে ভুগছে দেশটি।
সময়ের আলো/এসএকে