মোজার বল থেকে বিশ্বমঞ্চের নকআউট : কেপ ভার্দের রূপকথার নেপথ্যে ‘বুবিস্তা’

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

বোয়া ভিস্তা দ্বীপের পোভোয়াসাও ভেলহা গ্রামের পুরো এলাকা জুড়ে ছিল মোটে একটি মাত্র টেলিভিশন। বিশ্বকাপের উত্তেজনাকর রাতগুলোতে সেই একটি টিভির

2026-06-27T16:19:19+00:00
2026-06-27T16:19:19+00:00
 
  শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬,
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
খেলা
মোজার বল থেকে বিশ্বমঞ্চের নকআউট : কেপ ভার্দের রূপকথার নেপথ্যে ‘বুবিস্তা’
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬, ৪:১৯ পিএম 
পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো। সংগৃহীত ছবি
বোয়া ভিস্তা দ্বীপের পোভোয়াসাও ভেলহা গ্রামের পুরো এলাকা জুড়ে ছিল মোটে একটি মাত্র টেলিভিশন। বিশ্বকাপের উত্তেজনাকর রাতগুলোতে সেই একটি টিভির সামনেই উপচে পড়ত গ্রামের সাধারণ মানুষের ভিড়। আর সবার পেছনে ঠাঁই নিয়ে এক ছোট্ট ছেলে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখত ডিয়েগো ম্যারাডোনা আর লোথার ম্যাথাউসের জাদুকরী ফুটবল শৈলী। খেলা শেষে বাড়ি ফিরলে মা তাকে ভালোবেসে মোজা দিয়ে একটি বল বানিয়ে দিতেন। সেই মোজার তৈরি বল পায়ে চেপেই শুরু হয়েছিল ছেলেটির ফুটবলের দীর্ঘ পথচলা।

কয়েক দশক কেটে গেছে। শৈশবের সেই ছোট্ট ছেলেটিই পরে টানা ১১ বছর কেপ ভার্দে জাতীয় দলের অধিনায়কের আর্মব্যান্ড সামলেছেন। ফুটবল দুনিয়া আজ তাকে একনামে চেনে ‘বুবিস্তা’ হিসেবে, যদিও তার আসল নাম পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো। বোয়া ভিস্তা দ্বীপে জন্ম নেওয়ার কারণেই ছোটবেলার সেই ‘বুবিস্তা’ ডাকনামটি আজ তার স্থায়ী পরিচয়। শনিবার সকালে হিউস্টনের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে ৫৬ বছর বয়সী এই মানুষটিই লিখলেন নিজের দেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। তার জাদুকরী কোচিংয়েই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পা রাখল আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে।


বিশ্বকাপের এই মূল মঞ্চে পৌঁছানোর রাস্তাটা কেপ ভার্দের জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। টানা সাতবার ব্যর্থতার তেতো স্বাদ পাওয়ার পর, এবারই প্রথম বিশ্বমঞ্চে খেলার টিকিট পায় আফ্রিকান ‘ব্লু শার্কস’রা। আর প্রথম সুযোগেই তারা কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো ফুটবল বিশ্বকে। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের গ্রুপে থেকেও অপরাজিত রানার্সআপ হিসেবে শেষ বত্রিশ নিশ্চিত করেছে তারা। সাধারণ মানুষের চোখে এটি স্রেফ রূপকথা মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে গত দুই দশকের নিখুঁত পরিকল্পনা, অপরিসীম ধৈর্য আর হাড়ভাঙা খাটুনি।

কেপ ভার্দের এই অবিস্মরণীয় সাফল্যের অন্যতম মূল স্তম্ভ হলেন তাদের সেন্টার-ব্যাক লোগান কস্তা। ভিয়ারিয়ালের এই ডিফেন্ডার গত বছরের জুলাই মাসে এসিএল ইনজুরির কবলে পড়ে প্রায় ১০ মাস মাঠের বাইরে ছিটকে গিয়েছিলেন। বিশ্বকাপের ঠিক আগে গত ১৭ মে লা লিগার ম্যাচে কেবল ১৩ মিনিটের জন্য মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এমন একজন ম্যাচ-ফিটনেসবিহীন ফুটবলারকে স্কোয়াডে রাখা নিয়ে চারদিকে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। তবে কোচ বুবিস্তা তার ওপর থেকে ভরসা হারাননি। কোচের সেই আস্থার প্রতিদান কস্তা দিয়েছেন হাতেনাতে। পুরো গ্রুপ পর্বে স্পেন, উরুগুয়ে কিংবা সৌদি আরব—কোনো দলই সহজে ভাঙতে পারেনি কস্তাদের রক্ষণব্যুহ। মূলত এই সুসংগঠিত ডিফেন্সই ছিল টুর্নামেন্টে কেপ ভার্দের প্রধান শক্তি।


কেপ ভার্দের মোট জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখের মতো। তবে দেশের সীমানার চেয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী কেপ ভার্দিয়ানদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। আর পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা এই প্রতিভাদেরই এক সুতোয় গেঁথেছেন বুবিস্তা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় মিডফিল্ডার জামিরো মন্তেইরোর কথা, যার জন্ম হয়েছিল নেদারল্যান্ডসের রটারডামে। এক অভিবাসী পরিবারে বড় হওয়া এই ছেলেটি ফুটবল শিখেছেন পাড়ার গলিতে খেলে। এরপর নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকার ঘুরে একসময় জায়গা করে নেন কেপ ভার্দে জাতীয় দলে। বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে এসওয়াতিনির বিপক্ষে নিজের ৫০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার দিনই মূলত কেপ ভার্দের বিশ্বকাপের টিকিট পাকা করেছিলেন তিনি।

কেভিন পিনার গল্পটাও বেশ চমকপ্রদ। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের ব্রকটনের রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে ফুটবল খেলার সময় হঠাৎই তিনি নজর কাড়েন সাবেক অধিনায়ক কার্লোস মোরাইসের। ব্যস, সেখান থেকেই শুরু তার পেশাদার ফুটবলের যাত্রা। বর্তমানে তিনি খেলছেন রাশিয়ার ক্রাসনোদার ক্লাবে। চলতি বিশ্বকাপে উরুগুয়ের বিপক্ষে তার নেওয়া ফ্রি-কিকের দুর্দান্ত গোলটি এখনো আসরের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে গণ্য হচ্ছে।


একই ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে সাইডবেঞ্চ থেকে মাঠে নেমে সমতাসূচক গোল করে নায়ক বনে যাওয়া হেলিও ভারেলা খেলেন ইসরায়েলের একটি ক্লাবে। এই ম্যাচের আগে হয়তো ফুটবল দুনিয়ার খুব কম মানুষই তার নাম জানত, কিন্তু ওই একটি গোলই তাকে চিরদিনের জন্য কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।

আরেক ডিফেন্ডার পিকো লোপেসের গল্পটা তো আরও মজার। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার প্রথমে ভেবেছিলেন, পেশাদার যোগাযোগের মাধ্যম ‘লিংকডইন’-এ পর্তুগিজ ভাষায় আসা কেপ ভার্দের কোচের বার্তাটি বোধহয় কোনো ভুয়া বা স্প্যাম মেসেজ! পরে অবশ্য ভুল ভেঙেছিল এবং বুঝতে পেরেছিলেন যে এটি আসলে জাতীয় দলের রাজকীয় ডাক। সেদিন যদি তিনি ওই বার্তাটি অবহেলা করতেন, তবে আজ হয়তো এই অনন্য ইতিহাসের অংশ হওয়াই হতো না।

এদিকে গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ভোজিনহা এখন পুরো দেশের চোখের মণি। শক্তিশালী স্পেনের বিপক্ষে একাই সাত-সাতটি দুর্দান্ত সেভ করে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতেন এই গোলরক্ষক। ম্যাচ শেষের শেষ বাঁশি বাজার পর তিনি নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। কারণ সেই আনন্দের মুহূর্তে তার বড্ড মনে পড়ছিল প্রয়াত দাদা-দাদির কথা—যাদের হাত ধরেই শৈশবে ফুটবলের সাথে তার প্রথম পরিচয় ঘটেছিল।

এই দলে ৩৬ বছর বয়সী অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেস হলেন সবচেয়ে অভিজ্ঞ সেনানি। গত ১৬ বছরে দেশের জার্সিতে ৯৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে কেপ ভার্দে ফুটবলের প্রতিটি ভালো-মন্দ সময়ের সাক্ষী হয়ে আছেন তিনি। আর ২৫ বছর বয়সী তরুণ ডেইলন লিভ্রামেন্তো বাছাইপর্বে ক্যামেরুন ও এসওয়াতিনির বিপক্ষে অতি গুরুত্বপূর্ণ গোলগুলো করে বিশ্বকাপের মূল পর্বের দরজাটা খুলে দিয়েছিলেন। টুর্নামেন্ট শুরুর পর সেই গোলগুলোর কথা হয়তো আড়ালে পড়ে গেছে, তবে ইতিহাসের মূল ভিত্তিটা গড়া হয়েছিল সেখানেই।


কেপ ভার্দের জন্য এই বিশ্বকাপ যাত্রা কেবলই একটি সুন্দর স্বপ্ন নয়, বরং ভবিষ্যতের এক বড় বিনিয়োগ। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব পার করার সুবাদে ফিফার কাছ থেকে দলটি পাচ্ছে এক কোটি পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার। দেশের ফুটবল ফেডারেশনের পরিকল্পনা রয়েছে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থের পুরোটাই খরচ করা হবে দেশের ফুটবল অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত তরুণ প্রতিভাদের খুঁজে বের করার কাজে। ফলে ইউরি মার্লে ফার্নান্দেসের মতো ১৪ বছর বয়সী একাডেমি ফুটবলারদের নতুন প্রজন্মকে এখন আর বিশ্বমঞ্চের স্বপ্ন দেখতে দ্বিধা করতে হয় না। তারা চোখের সামনে বড় হতে দেখছে এমন এক জাতীয় দলকে, যারা আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে এবং ক্যামেরুনের মতো পরাশক্তিকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে। তাদের কাছে বিশ্বমঞ্চ এখন আর ধরাছোঁয়ার বাইরের কোনো কল্পনা নয়।

সৌদি আরব ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে বুবিস্তা বলেছিলেন, ‘সবারই স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে। অসম্ভব বলে আসলে কিছু নেই।’ ছোটবেলায় মোজার তৈরি বল দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা এই মানুষটি খুব ভালো করেই জানেন, বিশ্ব ফুটবলের দরবারে নিজেদের সম্মান আদায় করে নিতে ঠিক কতটা রক্ত আর ঘাম ঝরাতে হয়।

আগামী ৪ জুলাই নকআউট পর্বের মহালড়াইয়ে তাদের মুখোমুখি হতে হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। যেখানে প্রতিপক্ষ শিবিরে থাকবেন স্বয়ং লিওনেল মেসি। পোভোয়াসাও ভেলহা গ্রামের সেই ছোট্ট ছেলেটি একদা অন্যের ঘরের টেলিভিশনে এর চেয়েও বড় বড় ফুটবলীয় ম্যাজিক দেখে বড় হয়েছে। এবার বিশ্বকাপের সবচেয়ে জমকালো মঞ্চে দাঁড়িয়ে তার নিজের গল্পটা নতুন করে লেখার পালা।

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো  বুবিস্তা  বিশ্বমঞ্চ  নকআউট 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: