একসময় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় বিচ্ছিন্ন একটি দেশের প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হতো ইরানের তৈরি আত্মঘাতী ড্রোন ‘শাহেদ-১৩৬’-কে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার দক্ষিণ কোরিয়াও কম খরচে তৈরি দীর্ঘপাল্লার কামিকাজে ড্রোন তৈরির পথে হাঁটছে, যার প্রযুক্তিগত ধারণার সঙ্গে ইরানের শাহেদ-১৩৬-এর স্পষ্ট মিল পাওয়া যাচ্ছে।
শনিবার (২৭ জুন) ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা মেহেরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘লুকাস’ মডেলের ভিত্তিতে নতুন একটি আত্মঘাতী ড্রোন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এর আগে মার্কিন সাময়িকী ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট এক প্রতিবেদনে দাবি করেছিল, ‘লুকাস’ ড্রোনটি মূলত ইরানের শাহেদ-১৩৬-এর রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং বা পুনঃপ্রকৌশল সংস্করণ।
এ অবস্থায় দক্ষিণ কোরিয়ার একই পথে এগোনো নতুন করে আলোচনায় এনেছে ইরানের ড্রোন প্রযুক্তিকে। একসময় যেটিকে শুধুই ইরানের নিজস্ব সামরিক উদ্ভাবন হিসেবে দেখা হতো, সেটিই এখন কম খরচে কার্যকর মানববিহীন যুদ্ধ প্রযুক্তি তৈরির বৈশ্বিক মডেলে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু একটি ড্রোনের জনপ্রিয়তা নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ভারসাম্যে ইরানের অবস্থানের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা বিশ্বে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা কোনো দেশ উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে না। কিন্তু গত চার দশকের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ইরান মানবসম্পদ, নিজস্ব জ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার ওপর গুরুত্ব দেয়। এর ফলে দেশটিতে গড়ে ওঠে হাজার হাজার জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, গবেষণা কেন্দ্র ও প্রযুক্তি কমপ্লেক্স। ন্যানোপ্রযুক্তি, চিকিৎসা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে তারা প্রতিযোগিতামূলক পণ্য তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
এই আত্মনির্ভরতার অন্যতম উদাহরণ ইরানের মানববিহীন আকাশযান শিল্প। যখন বিশ্বের বড় শক্তিগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল অস্ত্রব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছিল, তখন ইরান বেছে নেয় ভিন্ন পথ— কম খরচে, সহজ কাঠামোর, ব্যাপক উৎপাদনযোগ্য কিন্তু কার্যকর অস্ত্রব্যবস্থা।
শাহেদ-১৩৬ এই কৌশলেরই প্রতিফলন। এটি প্রযুক্তিগত জটিলতায় হয়তো সবচেয়ে উন্নত নয়, কিন্তু স্বল্প ব্যয়ে কার্যকর আঘাত হানার সক্ষমতা দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। বর্তমান বিশ্বে কোনো প্রযুক্তির মূল্য শুধু তার জটিলতার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার কার্যকারিতা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী হওয়ার ওপর। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন সামরিক শক্তি এখন কম খরচের আত্মঘাতী ড্রোন তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন উদ্যোগের তাৎপর্য এখানেই। যদি আগে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে শাহেদ-১৩৬ অনুকরণের অভিযোগ উঠত, এখন ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশও একই ধরনের মডেল অনুসরণ করছে। ফলে শাহেদ-১৩৬ এখন আর কেবল একটি ইরানি পণ্য নয়; বরং বৈশ্বিক মানববিহীন যুদ্ধ প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স মডেলে পরিণত হয়েছে।
সময়ের আলো/কেএইচও