ভারতের স্বাধীনতা দিবসের আগে দেশটিতে দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন প্রকৌশলী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় তিনি দেশের ভবিষ্যৎ গড়তে পারেন এমন ‘নিঃস্বার্থ, নির্ভীক ও যোগ্য’ নারী-পুরুষের নাম প্রস্তাব করতে নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান।
ওয়াংচুক বলেন, গত কয়েক দিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। এ সময় ভারত, ভারতের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেছেন তিনি। ৫০ বছর আগে যেসব প্রতিবেশী দেশ ভারতের পেছনে ছিল বা সমান অবস্থানে ছিল, সেগুলো এখন ভারতকে অনেক পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে মাথাপিছু জিডিপির কথা উল্লেখ করে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের নাম বলেন তিনি।
ওয়াংচুক সতর্ক করে বলেন, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তিতে ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারত উন্নত দেশে পরিণত হতে পারবে না। এমনকি বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নিজের অবস্থান ধরে রাখতে ভারতকে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তিনি বলেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি ‘সম্মানজনক দেশ’ হিসেবে টিকে থাকতে হলে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।
গত দুই মাসে পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন ও প্রতিবাদ করা মানুষদের অভিনন্দন জানান ওয়াংচুক। তিনি বলেন, ওই আন্দোলনের পর কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তন এসেছে। ভারতীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি একথা বলেন।
ওয়াংচুক বলেন, ‘একদিকে আমি আপনাদের অভিনন্দন জানাতে চাই। আপনারা পরিবর্তন চেয়েছেন এবং গত দুই মাস প্রতিবাদ করেছেন। পরিবর্তনও এসেছে—শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু পরবর্তী শিক্ষামন্ত্রীর কাছ থেকেও আমি কোনও অলৌকিক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না।’
ভারতের অগ্রগতি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ওয়াংচুক বলেন, ‘শিক্ষা যতদিন পিছিয়ে থাকবে, দেশের ভবিষ্যৎও ততদিন পিছিয়ে থাকবে।’
তিনি বলেন, ভারতের শাসনব্যবস্থার সমস্যার জন্য কোনও একটি রাজনৈতিক দলকে দায়ী করা যায় না। দিল্লি ও বিভিন্ন রাজ্যের সরকারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ভিন্ন ভিন্ন দলের সরকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে ওঠা কণ্ঠস্বর দমন করেই চলেছে।
তিনি বলেন, ‘দিল্লিতে একটি দলের সরকারের বিরুদ্ধে কণ্ঠ উঠেছিল। এরপর অন্য রাজ্যে অন্য দলের সরকারও একই ধরনের অন্যায় করেছে এবং একইভাবে সেই কণ্ঠ দমন করেছে। তাই এটি কোনও নির্দিষ্ট দলের বিষয় নয়।’
২০১২-১৩ সালের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের কথাও উল্লেখ করেন ওয়াংচুক। ওই আন্দোলনের পর দিল্লিতে সরকার পরিবর্তন হলেও দুর্নীতি ও অন্যায় দূর হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ওয়াংচুক বলেন, ‘কিন্তু ১২ বছর পর আজ দুর্নীতি ও অন্যায় নতুন রূপ নিয়েছে। এটি আগের চেয়ে দুই-তিন গুণ বড় হয়েছে এবং এখন আমাদের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের ভয় দেখাচ্ছে।’
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তার সমালোচনা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা বিরোধীদের লক্ষ্য করে নয়। তিনি বলেন, ‘আমি কোনও নির্দিষ্ট দল বা বিরোধীদের কথা বলছি না, আমি দেশের কথা বলছি।’
এমন অবস্থায় ভারতে ‘বড় ধরনের পরিবর্তনের’ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন ওয়াংচুক। তিনি যে পরিবর্তন চান, সেটিকে ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লব’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার। এই দেশে একটি বিপ্লব দরকার, একটি শান্তিপূর্ণ বিপ্লব দরকার, যাতে আমরা সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যেতে পারি।’
ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাছাইয়ের পদ্ধতিতে বলে মনে করেন তিনি। ওয়াংচুক বলেন, ‘কারণ সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আমরা কীভাবে নেতৃত্ব বেছে নিই। নেতারা সঠিক না হলে পুরো দেশই ভুল পথে চলবে।’
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি মামলাগুলো নিয়েও উদ্বেগ জানান তিনি। ওয়াংচুক বলেন, এখনও অনেক নেতা সত্যের পথে আছেন এবং সম্মানের যোগ্য। তবে এত বেশি আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলে দেশ কীভাবে উন্নতি করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আপনারা কি জানেন, আমাদের সংসদের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এক-তৃতীয়াংশের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ ও অপহরণের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশ কীভাবে উন্নতি করবে?’
ওয়াংচুকের এই বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি মামলা ও গুরুতর অভিযোগ। তবে তিনি আবারও বলেন, কোনও নির্দিষ্ট দল বা রাজনৈতিক পক্ষকে লক্ষ্য করে তিনি এসব কথা বলছেন না।
ভারতের কী পরিবর্তন প্রয়োজন এবং কীভাবে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে একত্র করতে চান বলে জানান ওয়াংচুক। তিনি বলেন, ‘দেশের যেখানেই থাকুন না কেন, আমি সেরা মেধাবী মানুষদের সঙ্গে পরামর্শ করতে চাই। কী পরিবর্তন দরকার এবং কীভাবে তা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করতে চাই।’
তবে শুধু বুদ্ধিজীবীদের খুঁজছেন না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি। এক্সে দেয়া এক পোস্টে ওয়াংচুক বলেন, ‘শুধু চিন্তা করেন এমন বুদ্ধিজীবী নয়, এমন নিঃস্বার্থ, নির্ভীক নারী-পুরুষ চাই, যাদের চরিত্র ও যোগ্যতা আছে।’
লাদাখে বসবাসকারী ওয়াংচুক বলেন, এমন মানুষদের কোথায় পাওয়া যাবে, তা তিনি জানেন না। তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নাগরিকদের অন্তত একজন করে এমন ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘দুর্গম লাদাখে বসে আমি জানি না তারা কারা বা কোথায় আছেন। তাই আপনারা দেশের এবং আপনাদের নিজ নিজ অঞ্চল থেকে অন্তত একজনের নাম প্রস্তাব করে আমাকে সাহায্য করতে পারেন।’
সময়ের আলো/জেডআই