ভালো বেতনে কোম্পানির চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দালালের মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার বাসিন্দা আলী হাসান সোহেলকে (৪২)। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। নির্মাণকাজের পরিবর্তে তাকেসহ আরও কয়েকজন বাংলাদেশিকে জোরপূর্বক হস্তান্তর করা হয় রুশ সেনাবাহিনীর কাছে। এরপর দেওয়া হয় অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ এবং পাঠানো হয় ইউক্রেন সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রে।
বর্তমানে ড্রোন হামলায় আহত হয়ে একটি চিকিৎসাশিবিরে (মেডিকেল ক্যাম্প) চিকিৎসাধীন রয়েছেন সোহেল। সম্প্রতি সেখান থেকে ভিডিও কলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন তিনি।
আলী হাসান সোহেল রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার জুড়ান মোল্লার পাড়া (কুমড়াকান্দি) এলাকার আব্দুল হকের ছেলে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় সোহেলই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এই ঘটনায় সোহেলের পরিবারসহ ভুক্তভোগী আরও তিনটি পরিবার গত ১৯ মে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে।
ঢাকার মালিবাগের 'জাবেল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড' নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সি এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। তারা কোম্পানির চাকরির কথা বলে সোহেলসহ চারজনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৭ লাখ টাকা করে মোট ২৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। মেডিকেল ও বিএমইটি ক্লিয়ারেন্স সম্পন্ন করে গত ৭ মে তাদের রাশিয়ায় পাঠানো হয়।
পরিবারের অভিযোগ, রাশিয়ায় পৌঁছানোর মাত্র তিন দিনের মাথায় সোহেলসহ ৩০ জন বাংলাদেশিকে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে তাদের চুল কেটে, সামরিক পোশাক পরিয়ে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সুযোগ পেয়ে সোহেল ফোনে পরিবারকে জানান, তাদের প্রত্যেককে প্রায় ৩০ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বিনিময়ে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে ওই চক্রটি।
একইভাবে প্রতারণার শিকার গোপালগঞ্জের পলাশ শেখের বাবা জামিল শেখ অভিযোগ করেন, কোম্পানির চাকরির নাম করে তাদের সন্তানদের প্রতারণার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ঘটনাটি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এবং উল্টো পরিবারগুলোকে ভয়ভীতি দেখায়।
সোহেলের বাবা আব্দুল হক জানান, ধারদেনা করে সাত লাখ টাকা জোগাড় করে ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে ছেলেকে যুদ্ধে অংশ নিতে হবে, তা তারা কল্পনাও করেননি। তিনি সরকারের কাছে ছেলেকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানান।
দীর্ঘ দেড় মাস যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর স্বামীর ভিডিও কল পান স্ত্রী আকলিমা খাতুন। তিনি বলেন, ভিডিও কলে স্বামীকে আহত অবস্থায় দেখতে পাই। তার হাত ব্যান্ডেজ করা, কানে তুলা দেওয়া এবং মুখভর্তি দাড়ি। তিনি শুধু কাঁদছিলেন আর বলছিলেন যেন তাকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ঘরে তিন সন্তান আর বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে আমরা এখন চরম মানবিক ও আর্থিক সংকটে পড়েছি।
সোহেলের মা আনজিলা বেগম বুকফাটা আর্তনাদ করে বলেন, আমি আর কিচ্ছু চাই না, শুধু আমার ছেলেকে জীবিত ফেরত চাই।
চিকিৎসাশিবির থেকে ভিডিও কলে আলী হাসান সোহেল জানান, মাসে ৬০ হাজার রুবল বেতনে তাদের নির্মাণকাজে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাশিয়ায় নামার পর বিমানবন্দর থেকেই সরাসরি তাদের সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। কয়েক দিনের সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং দিয়েই হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে পাঠানো হয় ফ্রন্টলাইনে (যুদ্ধক্ষেত্রে)। ৩০ জনের যে দলটি একসঙ্গে গিয়েছিল, তাদের অনেকেরই এখন আর কোনো খোঁজ নেই। তিনি নিজে এবং গোপালগঞ্জের পলাশ শেখ ড্রোন হামলায় আহত হয়ে বর্তমানে চিকিৎসাশিবিরে আছেন। তারা বাংলাদেশ সরকারের কাছে দ্রুত উদ্ধারের আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
এই বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস জানান, ঘটনাটি তিনি অবগত আছেন এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
সময়ের আলো/জোই