দেশের প্রতিটি জেলাকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনার মেগা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা হয়ে পায়রা বন্দর পর্যন্ত ২৪৪ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই (সমীক্ষা) শেষ হয়েছে। বর্তমানে এই প্রকল্পের জন্য অর্থায়নের উৎস খুঁজছে সরকার। একই সঙ্গে রেল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা বাকি জেলাগুলোতেও দ্রুত সমীক্ষা শুরু হবে বলে জানিয়েছেন রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিশাল বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল পেতে হলে শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে পণ্য পরিবহনের বাণিজ্যিক সংযোগ এবং জেলাভিত্তিক অর্থনৈতিক হাব গড়ে তোলা জরুরি।
পদ্মা সেতু রেললিংক প্রকল্পের সুবাদে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেললাইন চালু হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে রেল সম্প্রসারণের স্বপ্ন এখন অনেকটাই দৃশ্যমান। ভাঙ্গা থেকে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর এবং বরিশাল বিভাগের বরিশাল, ঝালকাঠি, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলা হয়ে পায়রা বন্দর পর্যন্ত ২৪৪ কিলোমিটার রেলপথের নকশা ও সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে এর অর্থায়নের জন্য বিদেশি দাতা সংস্থা বা উৎসের সন্ধান করছে সরকার। পায়রা বন্দরে একটি অর্থনৈতিক জোন এবং বরিশালে একটি আধুনিক ‘মাল্টিমোডাল হাব’ সহ মোট ১৯টি বড় রেল স্টেশন নির্মাণ করা হবে। নিচু জমি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ১৭ কিলোমিটার অংশে হবে উড়াল রেলপথ (ভায়াডাক্ট)। এছাড়া কীর্তনখোলা ও পায়রাসহ বিভিন্ন নদীর ওপর ৪৬টি বড় সেতু নির্মাণ করা হবে। কোনো লেভেল ক্রসিং ছাড়াই ট্রেন চলাচলের জন্য পুরো রুটে পর্যাপ্ত আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানান, বর্তমানে দেশের ৪৮টি জেলায় প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। বাকি জেলাগুলোতেও সংযোগ বাড়াতে সরকার কাজ করছে।
তিনি বলেন, আমাদের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী প্রতিটি জেলাই পর্যায়ক্রমে রেল সংযোগের আওতায় আসবে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩টি জেলা (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান) এবং দ্বীপ জেলা ভোলার সঙ্গে আমাদের কোনো রেল সংযোগ নেই। ঢাকার আশপাশের জেলাসহ রেলের বাইরে থাকা সব অঞ্চলে রেল সম্প্রসারণের জন্য খুব শিগগিরই সম্ভাব্যতা যাচাই বা সমীক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।
যোগাযোগ ও রেল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান এই মেগা প্রকল্প নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, শুধু রেললাইন নির্মাণ করলেই হবে না, এর সঙ্গে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা যুক্ত করতে হবে। পায়রা বন্দরের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি আমদানি-রফতানিযোগ্য বাণিজ্যিক করিডোর তৈরি করতে হবে। রেল সম্প্রসারণের সঙ্গেই বন্দর থেকে মালামাল পরিবহনের সুযোগ সম্বলিত প্রকল্পগুলো একই সঙ্গে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
যদি যথাযথ ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংক (যোগাযোগ সংযোগ) তৈরি না করে কেবল যাত্রী পরিবহনের জন্য এত বড় ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ ও বিপুল বিনিয়োগ করা হয়, তবে এই করিডোরটি সরকার তথা জনগণের জন্য বড় ঋণের বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ল্যান্ড ইউজ ও ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানের সমন্বয় ড. হাদিউজ্জামান বলেন, জমির ব্যবহার (ল্যান্ড ইউজ প্ল্যান) এবং পরিবহন পরিকল্পনার (ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান) মধ্যে যদি মেলবন্ধন তৈরি না হয়, তবে রেলপথ ঠিকই তৈরি হবে কিন্তু তার অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক উপযোগিতা মিলবে না। তাই প্রতিটি জেলার নিজস্ব বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে রেলের সঙ্গে যুক্ত করার মাস্টারপ্ল্যান একসঙ্গেই নিতে হবে।
সময়ের আলো/জোই