এজেন্সির প্রলোভনে চীনে গিয়ে দুর্বিপাকে শিক্ষার্থীরা

সাব্বির আহমেদ, চীন থেকে ফিরে

শিক্ষা

বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে চান তাদের অনেকের পছন্দ চীন। চীন প্রতিযোগিতামূলক উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত, যেখানে প্রতি

2026-07-02T01:26:55+00:00
2026-07-02T01:29:05+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
শিক্ষা
এজেন্সির প্রলোভনে চীনে গিয়ে দুর্বিপাকে শিক্ষার্থীরা
সাব্বির আহমেদ, চীন থেকে ফিরে
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ১:২৬ এএম  আপডেট: ০২.০৭.২০২৬ ১:২৯ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে চান তাদের অনেকের পছন্দ চীন। চীন প্রতিযোগিতামূলক উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত, যেখানে প্রতি বছর হাজারো শিক্ষার্থী এ দেশে পড়াশোনার জন্য আসেন। অনেকেই এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করেন, আবার অনেকে স্বতন্ত্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। 

তবে বর্তমানে একটি গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছে- এজেন্টরা শিক্ষার্থীদের মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছে যে, চীন এলে টিউশন এবং আবাসনের খরচ পুরোপুরি ফ্রি এবং সঙ্গে চাকরির সুযোগও আছে। বিশেষ করে ব্যাচেলর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে, অনেক সময় দেখা যায়, প্রথম বছর এক ধরনের ফ্রি সুবিধা থাকলেও, পরে টপ ১০ বা টপ ২০ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী ছাড়া বেশিরভাগকেই টিউশন ও আবাসনের খরচ বহন করতে হয়। 

এ ছাড়া চীনে থাকা অবস্থায় কাজ করা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ কিন্তু অনেকেই এই ভুল তথ্যের ফাঁদে পড়ে বিপদে পড়ছেন। এই প্রতারণার বিরুদ্ধে সতর্কতা, শিক্ষার্থীদের সচেতনতা এবং সঠিক তথ্য যাচাইয়ের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

চীনে পড়াশোনার পাশাপাশি বাইরে সাধারণ খণ্ডকালীন চাকরি (পার্ট-টাইম জব) করা সম্পূর্ণ বেআইনি। এজেন্সিগুলো সাধারণত কাজের প্রলোভন দেখিয়ে থাকে, তবে বাস্তব পরিস্থিতি হলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য চীনের আইন অত্যন্ত কঠোর।

চীনের প্রায় সব প্রদেশেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছেন। বর্তমানে ত্রিশ হাজারের মতো শিক্ষার্থী চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। জিয়াংসু প্রদেশকে ‘স্টুডেন্ট হাব’ বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ স্টুডেন্ট চীনের এই প্রদেশে থাকে। চায়নায় স্টুডেন্ট ভিসা বা রেসিডেন্স পারমিট শুধু পড়াশোনার জন্য দেওয়া হয়। এই ভিসায় বাইরে যেকোনো ধরনের অর্থ উপার্জন সম্পূর্ণ অবৈধ। কোনো নিয়ম না মেনে বাইরে কাজ করলে জরিমানা, ভিসা বাতিল বা চীন থেকে বহিষ্কার হওয়ার বড় ঝুঁকি থাকে। 

শর্তসাপেক্ষে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে কিছু খণ্ডকালীন কাজ যেমন- ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট, টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট বা প্রশাসনিক কাজ করা যায়। তবে এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অফিস (আইএসও) এবং পাবলিক সিকিউরিটি ব্যুরো (পিএসবি) থেকে লিখিত অনুমতি ও ওয়ার্ক পারমিট নিতে হয়।

তিন বছর আগে এজেন্সির মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার জন্য চায়না যান জামালপুরের এক শিক্ষার্থী। চীনের হেনান প্রদেশের ঝেংঝ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে পড়ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই শিক্ষার্থী এজেন্সির প্রতারণা নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান।
 
ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, এজেন্সি মানেই প্রতারক, পুরোপুরি বাটপারি। শতভাগ ভুয়া। এটা আমার কথা নয়, বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর বক্তব্য। আমি নিজেই তাদের ফাঁদে পড়েছি। চরম ভুক্তভোগী। আমি ‘এ আর এডুকেশন’ নামে একটি এজেন্সির মাধ্যমে চায়না আসি। তারা প্রথমে আমাকে বলে থাকা-খাওয়া, টিউশন খরচ সম্পূর্ণ ফ্রি। দেশে যেসব প্রলোভন তারা দেখায়, চায়না গিয়ে তার ছিটেফোঁটাও মিলে না। তাদের সাথে যোগাযোগ করলে এখন তারা যেন চিনতেই পারে না। সরকারের উচিত এদের আইনের আওতায় আনা।

এই শিক্ষার্থী বলেন, স্বাভাবিকভাবে নিজে আবেদন করে চায়না গেলে একজন স্টুডেন্টের বিমান ভাড়াসহ সব মিলিয়ে খরচ পড়বে বড়জোর ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। অথচ এজেন্সি হাতিয়ে নেয় দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে। আমার খরচ পড়েছে দেড় লাখ টাকা। এখানে কোনো কিছুই বিনামূল্যে পাচ্ছি না। 

স্টুডেন্ট ল্যান্ড করার পর এজেন্সি আর কোনো যোগাযোগ করে না। অর্থাৎ টাকাগুলো নেওয়ার পর তারা শিক্ষার্থীদের অথৈ সাগরে ছেড়ে দেয়। কথা কাজের মিল না পেয়ে যোগাযোগ করলে এজেন্সিগুলো খারাপ আচরণ করে। উল্টো তারা ইউনিভার্সিটিতে আমাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক রিপোর্ট করে দেবে বলে হুমকি দেয়। এমনকি তারা বলে পছন্দ না হলে দেশে ফিরে আসতে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, মালয়েশিয়া ইডু এয়ার এডুকেশন, ড্রিম এবরোড’সহ এমন কয়েকটি এজেন্সি আছে, যা আমার দেখা চরম লেভেলের ফ্রড। 
 
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার শিক্ষার্থী রাহাত হোসেন পরশ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের ওপর অনার্স শেষ করেছেন। বছর তিনেক আগে এক বছরের জন্য চায়না যান ইন্টার্নশিপ করতে। হাইনান প্রদেশ দ্য সানিয়া এডিশন হোটেলে ইন্টার্নশিপ শেষ করেন তিনি। 

সময়ের আলোকে রাহাত হোসেন বলেন, আমরা চায়নাতে এক বছরের ইন্টার্নশিপ করেছি। ওই সময় থাকা, খাওয়া ও চলাফেরার জন্য হোটেল কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে একটি বেতন দিত। কিন্তু বেতন থেকে একটা অংশ এজেন্সি কেটে রাখত। যদিও চুক্তিতে এটা উল্লেখ ছিল না। যেমন আমাদের বেতন ছিল বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৮ হাজার। সেখান থেকে এজেন্সি প্রতি মাসে ৫-৭ হাজার টাকা কেটে নিত।

এজেন্সির নাম জানতে চাইলে এই শিক্ষার্থী বলেন, আসলে আমরা জানি না। কারণ এখানে আমাদের ডিপার্টমেন্টের স্যার ছিল এবং চায়নার একজন প্রফেসর ছিলেন। এই দুজনের মাধ্যমে আমরা চায়না যাই। চায়নার যে প্রফেসর ছিলেন তিনি চায়নার দিকটি দেখেন। আর আমাদের ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্টের স্যারের মাধ্যমে আমরা ইন্টারভিউ, টাকা, এগ্রিমেন্ট যা আছে সব করেছি। স্যারও হয়তো দেশে তার পরিচিত কোনো এজেন্সির মাধ্যমে এসব করিয়েছেন। আমাদের টিকেটসহ যাবতীয় সবকিছু তিনিই ব্যবস্থা করেছেন। আমরা যখন চায়না যাই তখনই আমাদের ওই স্যার যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান পরিবারসহ। এখন তিনি আর দেশেই নেই।

কিছুটা ব্যতিক্রম করোনা ভাইরাসের সময় চায়নায় যাওয়া শিক্ষার্থী ফারিহা আজমাইন। ঢাকার উইস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষে করেই তিনি চায়না চলে যান। থাকেন চীনের রাজধানী বেইজিং থেকে এক হাজার কিলোমিটার দূরে সাংহাই প্রদেশে। 

অনার্স শেষ করা ফারিহা সময়ের আলোকে বলেন, আমি বন্ধুদের সহায়তায় নিজেই চেষ্টা করে অ্যাডমিশন পাই চায়নায়। চায়নাতে স্টাডি অবস্থায় জব করতেই পারবে না। করলে পুলিশ ধরে ফেলবে, অ্যাম্বাসিতে রিপোর্ট করবে। স্টাডি শেষ করে অবশ্যই জব করতে পারবে। 

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার আলাউদ্দিন এইচএসসি শেষ করেই স্কলারশিপ নিয়ে চীনে চলে আসেন। অনার্স করেছেন হুনান ইউনিভার্সিটিতে। এখন শাআনশি প্রদেশের চাংআন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। 

সময়ের আলোকে তিনি বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে চায়নায় যতক্ষণ স্টুডেন্ট ততক্ষণ কোনো জব নয়। এখানে পড়াশোনা অবস্থায় চাকরি অবৈধ। তবে এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে টিউশন ফ্রি থাকে। বাকি তিন বছর নির্দিষ্ট চার্জ দিতে হবে। এ ছাড়া সম্ভব নয়।  

সানজিদ হোসেন নামের এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সময়ের আলোকে বলেন, অন্তত এক বছর পড়ালেখা করে তারপর বিশ্ববিদ্যালয় এবং সুপারভাইজারের অনুমতি নিয়ে আপনি খণ্ডকালীন কাজ করতে পারেন। বাংলাদেশিদের সঙ্গে যেহেতু চীনাদের অনেক রকম ব্যবসা আছে, তাই কিছু কিছু কাজের সুযোগও আছে। 

পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়সের গোলজার হোসেন সাগর চীনে থাকেন দুই যুগ ধরে। তার বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জে। বেইজিংয়ে রেস্তোরাঁর ব্যবসা করেন। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, আমার রেস্তোরাঁয় একজন শিক্ষার্থী পার্ট-টাইম চাকরি করছেন। যদিও এটা বেআইনি। কিন্তু তারা এজেন্সির মাধ্যমে চীনে এসে বিপদে পড়েছেন। এত টাকা দেশের বাড়ি থেকে আনা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য।  

এ প্রসঙ্গে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বহির্গমন শাখার পরিচালক মো. তাজিম-উর-রহমান সময়ের আলোকে বলেন, আমরা সবসময় এজেন্সি কিংবা দালালের মাধ্যমে বিদেশে গমনকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করছি। তারপরও প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে অনেকে বিদেশে যায়। এর মধ্যে অনেক শিক্ষিত ছেলেও আছে। তারা বিদেশ গিয়ে মুশকিলে পড়ে। এই প্রতারক এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। 

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   এজেন্সি  প্রলোভন  চীন  দুর্বিপাক  শিক্ষার্থী  বাংলাদেশ 


Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: