এবারের বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দল তাদের নির্ধারিত সময়ের চেয়েও বেশি সময় বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে দাবি করে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, বিরোধী দলের জন্য মোট সময়ের ২৬ শতাংশ বরাদ্দ থাকলেও তারা প্রায় ৩১ শতাংশ সময় বক্তব্য দিয়েছে। সকল নেতাদের কথা শুনেছি। তারা যেভাবে বলতে চেয়েছেন, সেভাবে শুনেছি। বিরোধী দলের নেতারা ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট করেও বক্তব্য দিয়েছেন।
বিরোধী দলের বক্তব্য সরকার ‘গুরুত্ব দিয়ে শুনেছে’ দাবি করে চিফ হুইপ বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে তার এলাকার একটি সমস্যা তুলে ধরার পর প্রধানমন্ত্রী সেদিন সন্ধ্যায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে বাজেট অধিবেশন নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন।
চিফ হুইপ বলেন, সাধারণত বাজেট অধিবেশনে নির্দিষ্ট সময়ের পর মঞ্জুরি দাবি পাসের জন্য সরকারি দল থেকে গিলোটিন প্রস্তাব আসে। তবে এবার বিরোধীদলীয় নেতা নিজেই আলোচনা শেষে গিলোটিনে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের সংসদের ইতিহাসে বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে স্পিকারকে এ ধরনের অনুরোধ এবারই প্রথম।
বিরোধীদলীয় নেতা একটি পণ্যে কর ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন জানিয়ে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সেটিও বিবেচনায় নিয়েছেন। তার ভাষ্য, সরকার এবং বিরোধী দল ঐক্যভাবে দেশটাকে দাঁড় করাতে চায়। সরকার ও বিরোধী দল স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করতে চায়।
সংসদের বাজেট অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দলের ‘সহযোগিতা’কে আঁতাত নয় দাবি করে চিফ হুইপ বলেন, সংসদে কোনো ‘ফ্রেন্ডলি গেম’ চলছে না। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, আগের দিন বিরোধীদলীয় নেতা সরকার ও বিরোধী দলের ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। আবার বাজেট আলোচনায় সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য মেসি ও রোনালদোর ‘ফ্রেন্ডলি গেমের’ উদাহরণ টেনে বলেছেন, সংসদে এ ধরনের খেলা চলতে থাকলে একসময় মাঠ খালি হয়ে যাবে। ওই সাংবাদিক জানতে চান, সংসদে কোনো ‘ফ্রেন্ডলি গেম’ চলছে কি না। জবাবে চিফ হুইপ বলেন, রোনালদো আর মেসি ফুটবল খেলায় আছে, বিশ্বকাপে আছে। বাংলাদেশের পার্লামেন্টে কোনো খেলা নাই, গেমও নাই। কেউ এ ধরনের মন্তব্য করে থাকলে সেটি তার ব্যক্তিগত মত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চিফ হুইপ বলেন, সরকার এমন বিরোধী দল চায়, যারা যৌক্তিক বিষয়ে সহযোগিতা করবে, আবার প্রয়োজন হলে সরকারের সমালোচনাও করবে। যেটা জেনুইন, সেটা আমার পাশে থাকবে। যেটা জেনুইন না, সেটা আমার বিপক্ষে থাকুক, সেটা আমার সমালোচনা করুক। যাতে আমি সেটা সংশোধন করতে পারি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের কাজ সব সময় সরকারের বিরোধিতা করা নয়। কারণ বিরোধী দলও একদিন সরকারে যেতে পারে। আমরা একটা স্মুদ গণতন্ত্র চাই। সেই কারণে যেটা সহযোগিতা করা দরকার, সেটা সহযোগিতা করবে; যেটা সমালোচনা করা দরকার, সেটা সমালোচনা করবে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদের কার্যকারিতা, আইন প্রণয়নে বিল দেরিতে দেওয়া, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, হামে শিশু মৃত্যু, ‘পুশ-ইন’, জুলাই জাদুঘর ও সংসদীয় কমিটি গঠনসহ নানা বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, খাদ্যদ্রব্যসহ প্রয়োজনীয় ৬৩টি পণ্যে কর বাড়ানো হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে কর কমানো হয়েছে। যেসব পণ্যে কর কমেছে, সেগুলোর দামও কমা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। নূরুল ইসলাম মনির ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীকে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, সবকিছুতে কর কমালে সরকার চলবে কীভাবে। উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিবছর যে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, তা বন্ধ করা গেলে অর্থের সমস্যা হবে না।
আগের সরকারের ‘মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতি’ হয়েছে অভিযোগ করে চিফ হুইপ বলেন, বর্তমান সরকারের প্রকল্প হবে পদ্মা ব্যারেজ, তিস্তা ব্যারেজ, ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং কৃষি ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষাকেন্দ্রিক কর্মসূচি।
বাজেট অধিবেশন ঘিরে ডিনারের আয়োজন নিয়েও কথা বলেন নূরুল ইসলাম মনি। তিনি জানান, প্রথমে ডিনার না করার কথা উঠলেও পরে ‘ট্র্যাডিশন’ হিসেবে আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। তবে প্রধানমন্ত্রী ব্যয় কমানোর কথা বলেন। চিফ হুইপ বলেন, ৯০০ টাকার খাবারের খরচ কমিয়ে ১৫০ টাকায় আনা হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও হামে শিশু মৃত্যুর বিষয়গুলো বিবেচনা করে রাষ্ট্রের টাকা অপচয় না করার মনোভাব থেকেই এ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে তার দাবি।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, পৃথিবীতে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যার প্রধানমন্ত্রীর কোনো বাসভবন নেই।
তবে জুলাই জাদুঘর ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নিয়ে বাস্তবিক কোনো আলোচনা হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি সাংবাদিকদের মাধ্যমে তুলে রাখলেন।
সময়ের আলো/জেডআই