চীনের করিডোরে সম্ভাবনা চ্যালেঞ্জ

এমএকে জিলানী

জাতীয়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত চীন সফরে দেশটির শীর্ষনেতা বাংলাদেশকে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার (বিসিএম) অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। চীনের প্রস্তাবিত

2026-07-04T00:45:15+00:00
2026-07-04T00:45:15+00:00
 
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
চীনের করিডোরে সম্ভাবনা চ্যালেঞ্জ
এমএকে জিলানী
প্রকাশ: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪৫ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত চীন সফরে দেশটির শীর্ষনেতা বাংলাদেশকে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার (বিসিএম) অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। চীনের প্রস্তাবিত এই অর্থনৈতিক করিডোর এবং তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি। একদিকে এসব উদ্যোগ দেশের বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করছে, অন্যদিকে মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা, ভারতের সংবেদনশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য জটিল কৌশলগত বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে। ফলে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের এই দ্বৈত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ এখন কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতির ওপরই নির্ভর করছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম বিগত ১৯৭৭ সালে তার প্রথম সফরেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য চীনের স্বীকৃতি আদায় করেছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক অনেক পুরোনো। 

যার প্রতিফলন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত চীন সফরেও লক্ষ করা গেছে। এ সফরে চীন বাংলাদেশকে বিসিএম অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এই সফরে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র ইস্যুতে সমন্বিতভাবে এগিয়ে যেতে দুই দেশের মধ্যে টু প্লাস টু সংলাপ অনুষ্ঠানের জন্য উভয়পক্ষ সম্মতি প্রকাশ করেছে। 

বিসিএম প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গত বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বলেন, সরকার চীনের প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে দেখছে।

এদিকে প্রস্তাবটি অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সংযোগের দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার আগে ঢাকার উচিত রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে চীনের কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে কোনো ধরনের কৌশলগত বিরোধ সৃষ্টি না করে ভারসাম্যপূর্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।

বাংলাদেশ ২০১৬ সালে বিআরআই প্রকল্পে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়। যার আওতায় পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার অ্যান্ড পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক, ঢাকেশ্বরী স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, ডেভেলপমেন্ট অব আইসিটি ইন্ট্রা নেটওয়ার্ক ফর ফেজ-২৫, অষ্টম বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ নির্মাণসহ বাংলাদেশের কমবেশি নয়টি মেগা উন্নয়ন প্রকল্পে এই সময়ে চীনের বিনিয়োগ ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। যা চীনের বিআরআই প্রকল্পের অংশ। 


গত এক দশকে এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ উন্নতি করেছে। এই সফরে চীনের শীর্ষস্থানীয় ১২টি কোম্পানি মোট ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব পেশ করেছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, এই বিপুল বিনিয়োগ মূলত অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবেশ, লজিস্টিকস ও শিক্ষা খাতের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মেগা ও প্রধান প্রকল্পে করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। 

এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি চীন বিসিএম অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, যা বাংলাদেশ বিবেচনা করছে। চীনের বিআরআই প্রকল্পের লক্ষ্য সারাবিশ্বকে এক ছাতার নিচে আনা। প্রাচীনকালের সিল্ক রুটের আওতাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন এই প্রকল্পের লক্ষ্য। 

বেইজিং মনে করে, পরিকল্পনামাফিক আগামী ২০৪৯ সালে বিআরআই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সব দেশ সমানভাবে লাভবান হবে। এরই মধ্যে এই প্রকল্পের মাধ্যমে অন্তত ৬৮টি দেশ যুক্ত হয়েছে। ৬৮টি দেশ, ৬০ শতাংশ বিশ্ব জনসংখ্যা এবং ৪০ শতাংশ উৎপাদন নিয়ে এই নয়া রেশমপথ রচনা করছে এশীয় আদলের নতুন বিশ্বায়ন।

ঢাকার একজন কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশ গত ২০১৬ সালে চীনের বিআরআই প্রকল্পে যোগ দিয়েছে। এই মুহূর্তে চীন বাংলাদেশকে বিসিএম অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশকে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় বাস্তবভিত্তিক বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। চীনকে দিয়ে যদি রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করিয়ে নেওয়া যায়, তবে এই অঞ্চলের সবাই উপকৃত হবে। কেননা রোহিঙ্গা সংকট এখন এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এই সংকট সমাধান হলে এই অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগ যেমন সুরক্ষিত থাকবে তেমনি ভারতসহ অন্যরাও উপকৃত হবে। 

ঢাকার কূটনীতিকরা যদি দিল্লি ও বেইজিংয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে তবে তা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ঢাকার কূটনীতিকদের অসাধারণ কৌশল অবলম্বন করতে হবে। ঢাকার কূটনীতিকদের এ ক্ষেত্রে চীন-ভারতসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনামাফিক এগিয়ে যেতে হবে এবং রোহিঙ্গা সংকট যে সবার জন্যই নিরাপত্তার হুমকি তা তাদের বোঝাতে হবে। যেহেতু সামনের দিনে ঢাকা ও বেইজিং ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঢাকার পক্ষ থেকে এই সংলাপে রোহিঙ্গা সংকটটি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করলে সমাধান আসতে পারে।

এদিকে চীন ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্ব ফিরিয়ে আনার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি যদি ঢাকার কূটনীতিকরা ধরতে পারেন এবং কাজে লাগাতে পারেন, তবে বাংলাদেশ-ভারত-চীনসহ এই অঞ্চলের সবাই উপকৃত হবে। কলকাতায় নিযুক্ত চীনের কনসাল জেনারেল জু উই গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহে ভারত-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক বার্তা দিয়েছেন। 

গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহে তিনি ভারতের মূলধারার গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত নিবন্ধ এবং কলকাতায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের কনসাল জেনারেল জু উই দুই দেশের অংশীদারিত্বের ওপর বিশেষ জোর দেন। চীনের কূটনীতিক জু উই জোর দিয়ে বলেছেন, বর্তমান শতাব্দীকে অর্থনৈতিকভাবে সফল করতে হলে এশিয়ার দুই পরাশক্তি ভারত ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। 


তার মতে, ভারত ও চীন কেবল প্রতিবেশীই নয়, তারা বিশ্বের দুটি বৃহত্তম উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি। বিশ্ব অর্থনীতিতে এই দুই দেশের যৌথ অবদান ৪০ শতাংশের বেশি। তাই চীন ও ভারত একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং ‘বন্ধু ও অংশীদার’। তারা হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করলে প্রাচ্যের এই দুই প্রাচীন ভূমি বিশ্বের অন্যতম স্থিতিশীল শক্তিতে রূপ নিতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এস এম রাশেদ আহমেদ চৌধুরী দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, চীন ও ভারতসহ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে যুক্ত করে রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধান করা সম্ভব। এমন সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু এর জন্য কূটনৈতিক কৌশল থাকতে হবে। চীন যেহেতু বিসিএম করিডোরের প্রস্তাব দিয়েছে, তাই চীনকে বোঝাতে হবে যে রোহিঙ্গা সংকট জিইয়ে থাকলে বিসিএম করিডোর বাস্তবায়ন নিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে। 

আর এই সংকট সমাধানে ভারতকেও যুক্ত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন প্রচুর কূটনৈতিক তৎপরতা। এ ছাড়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এখন ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি, যা আমাদের জন্য মূল্যবান রিসোর্স। এটি আমাদের কাজে লাগাতে হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, চীন চাইলে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করা সম্ভব। এর আগে এই সংকট সমাধানে চীন উদ্যোগ নিলেও কোনো কাজ হয়নি। চীন কেন রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করবে, এই সংকট সমাধান করলে চীনের লাভ কী- এসব বিষয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে বেইজিংকে বোঝাতে পারলে সমাধান হতে পারে। রোহিঙ্গা সংকট চীন-ভারতসহ এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। বিষয়টি দুই দেশের সামনে যুক্তি দিয়ে তুলে ধরতে ঢাকার কূটনীতিকদের এক্সট্রা অর্ডিনারি ড্রাইভ দিতে হবে।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   চীন  করিডোর  চ্যালেঞ্জ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: