সমন্বয়হীন খোঁড়াখুঁড়িতে দুর্ভোগ

সমীরণ রায়

জাতীয়

মেগাসিটি রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ অনেক রাস্তায় চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। এতে প্রায় সর্বত্রই জনদুর্ভোগ বেড়েছে। কোথাও ওয়াসার পাইপলাইন বসানো, কোথাও গ্যাস সংযোগ,

2026-07-04T01:48:27+00:00
2026-07-04T01:48:27+00:00
 
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
সমন্বয়হীন খোঁড়াখুঁড়িতে দুর্ভোগ
সমীরণ রায়
প্রকাশ: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১:৪৮ এএম 
রাজধানীর মীরহাজিরবাগ এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজ কাজের ধীরগতিতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীসহ পথচারীদের। শুক্রবার তোলা। ছবি : সময়ের আলো
মেগাসিটি রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ অনেক রাস্তায় চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। এতে প্রায় সর্বত্রই জনদুর্ভোগ বেড়েছে। কোথাও ওয়াসার পাইপলাইন বসানো, কোথাও গ্যাস সংযোগ, কোথাও ড্রেনেজ সংস্কার, আবার কোথাও বিদ্যুতের আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন স্থাপনের কাজ চলছে। এই উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ সাধারণ মানুষের জন্য পরিণত হয়েছে চরম দুর্ভোগে।

বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম বা জুন-জুলাই এলেই এই খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু হয়ে যায়। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহসহ পয়োনিষ্কাশনের মতো কাজ শুরু করে বিভিন্ন সংস্থা। এ ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায় যে এক সংস্থার কাজের পর একই সড়কে আরেক সংস্থা নেমে যায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে। এতে ভোগান্তি দীর্ঘায়িত হয়। অবশ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, উন্নয়ন কাজ শেষ হলে নাগরিক সুবিধা বাড়বে।

ওয়াসা বলছে, নতুন পাইপলাইন বসানো হলে পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত হবে। সিটি করপোরেশন বলছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে জলাবদ্ধতা কমবে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও নিরবচ্ছিন্ন হবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা ছাড়া ঢাকার এই খোঁড়াখুঁড়ির সংস্কৃতি বন্ধ হবে না। খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া একান্তই জরুরি। এর মধ্যে সব সংস্থার মধ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকা জরুরি। কাজ শেষে দ্রুত রাস্তা সংস্কার করতে হবে। জনসাধারণকে আগাম তথ্য দিতে হবে যাতে তারা বিকল্প পথের ব্যবস্থা করতে পারে। এ ছাড়া ধুলা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পানি ছিটাতে হবে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা, মোহাম্মদপুর, পান্থপথ, কারওয়ান বাজার, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) সামনের রাস্তা, নিউমার্কেট, আজিমপুর, কমলাপুর, মগবাজার, খিলগাঁও ও মতিঝিল, সবুজবাগ, খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগ টেম্পো স্ট্যান্ড, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, পুরান ঢাকার প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই রাস্তা কেটে কাজ করছে একাধিক সংস্থা। 

ঢাকা ওয়াসা, বিটিসিএল, বিটিআরসি, তিতাস গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিভাগসহ অন্যান্য সব সংশ্লিষ্ট সংস্থা রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িতে ব্যস্ত। কোথাও রাস্তার একাংশ কেটে ফেলে কাজ ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও পুরো রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে গিয়ে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। বাড়ছে যানজটও। 

বর্ষার কারণে জলাবদ্ধ সৃষ্টি হচ্ছে।  কাটা রাস্তা মেরামত বা পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ হতে মাসের পর মাস লেগে যায়। আবার কোথাও কোথাও কাজ শেষ হলেও ফিনিশিং দেওয়া হয় না। ফলে যানজট, ধুলাবালি, জলাবদ্ধতা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায় বহুগুণে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম হওয়ায় এই দুর্ভোগের কোনো শেষ নেই। অবশ্য সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।


প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুম এলে চলে এই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। এই কাজগুলো সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বর্ষা শুরু হওয়ার আগে করলেই পারে। একদিকে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে জনদুর্ভোগের বাস্তবতা- এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঢাকাবাসী পিষ্ট হচ্ছে। 

জানা গেছে, ঢাকায় ৫০০ কিলোমিটারের বেশি সড়ক কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। এ প্রকল্পের কাজে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৪৫৩ কিলোমিটার এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ৭৬ কিলোমিটার সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি হবে। সংস্থাটির ‘ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের’ আওতায় দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নির্মাণ, পুনর্নির্মাণের জন্য ধাপে ধাপে এই সড়ক কাটা হবে। 

এ প্রকল্পটির ব্যয় ৫ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে কাজ শুরু হয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালে। একই সঙ্গে ঢাকার পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়নে ৫০ হাজার নতুন গৃহসংযোগ, পাগলা পয়োশোধনাগারের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিদিন ১৫ কোটি লিটার বর্জ্য পানি শোধনের লক্ষ্য রয়েছে। সড়ক খনন বাবদ দুই সিটি করপোরেশনের জন্য ৬৩০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। খননের ফলে রাস্তা, ফুটপাথ, নর্দমা বা অন্য অবকাঠামোর ক্ষতি হলে তা ঢাকা ওয়াসাকে নিজ খরচে মেরামত করতে হবে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির মূল সমস্যা সমন্বয়হীনতা। এক সংস্থা রাস্তা তৈরি করে, কয়েক দিন পর আরেক সংস্থা সেটি আবার কাটে। এতে সরকারি অর্থ যেমন অপচয় হয়, তেমনই বাড়ে জনভোগান্তি। পানি সরবরাহের লাইন ও পয়োনিষ্কাশন লাইন তৈরি, দুটি কাজই মাটির নিচের অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। সঠিক সময়ে সমন্বিত পরিকল্পনা করা গেলে সড়ক একাধিকবার খোঁড়াখুঁড়ি দরকার হয় না। এতে নগরবাসীও দীর্ঘ ভোগান্তি থেকে রেহাই পেত। 

রাজধানীতে কাজ করছে একাধিক সংস্থা। এরা হলো- ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। কিন্তু তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ফলে একটি রাস্তা বারবার কাটতে হয়। 

ওয়ান-স্টপ কো-অর্ডিনেশন ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এ ছাড়া ঢাকার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি শুধু দৈনন্দিন চলাচলে নয়, অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। পণ্য পরিবহন বিলম্বিত হচ্ছে, অফিসগামীদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এই সময়ক্ষেপণ ও জ্বালানি অপচয় মিলিয়ে প্রতিদিন কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

প্রায় তিন মাস আগে থেকে রাজধানীর রমনা পার্কের উল্টো দিকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) সামনে সড়কে রাস্তার বড় অংশ বন্ধ রেখে ঢাকা ওয়াসা কাজ করছে। এতে যান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে।

এই রুটের ৮ নম্বর বাস চালক রমজান মিয়া বলেন, তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে রাস্তাটির বড় অংশ বন্ধ রয়েছে।
খিলগাঁওয়ের ব্যবসায়ী রফিকুল হক ভোগান্তির কথা জানিয়ে বলেন, রাস্তা ভাঙা-কাটা, ধুলা ওড়ে, মানুষ হাঁটতেও কষ্ট পায়।
সিএনজি চালক আব্দুল করিম বলেন, এক রাস্তা দিয়ে গেলে দেখি হঠাৎ বন্ধ। আবার ঘুরে যেতে হয়। এতে যাত্রীর সঙ্গে ভাড়া নিয়েও ঝামেলা হয়, সময়ও নষ্ট হয়।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, একবার রাস্তা কেটে পানি সরবরাহের পাইপ বসানো, পরে আবার একই ধরনের খনন করে পয়োনিষ্কাশনের লাইন বসানো- এতে শুধু নাগরিক ভোগান্তিই বাড়ে না, সড়কের স্থায়িত্বও কমে যায়। জনদুর্ভোগের কারণ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অদক্ষতা, পরিকল্পনাহীনতা ও সমন্বয়হীনতা। মাটির নিচের অবকাঠামোর কাজ একসঙ্গে পরিকল্পনা করে করা উচিত।

ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, একই রাস্তা যেন বারবার খোঁড়াখুঁড়ি না করা লাগে এ জন্য রাস্তার কাজ শুরুর আগে ওয়াসা, বিটিসিএল ও তিতাস গ্যাসসহ অন্যান্য সব সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে চিঠি পাঠানো হয়। যাতে একবারেই সব প্রতিষ্ঠানের ইউটিলিটি লাইন স্থাপন করা যায়।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও 


  বিষয়:   সমন্বয়হীন  খোঁড়াখুঁড়ি  দুর্ভোগ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: