বিশ্বকাপ ফুটবল দেখা কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে এক দিনেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। সংঘাত-সংঘর্ষসহ প্রিয় দলের পতাকা লাগাতে গিয়েও আহতের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী কোনো দেশের সমর্থকদের এমন করুণ পরিণতি ভোগ করতে না হলেও বাংলাদেশে প্রতি বিশ্বকাপ ফুটবলে এমন মৃত্যু ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বকাপ ফুটবলটি উপলক্ষ মাত্র। মূলত জাতিগতভাবেই আমরা ভিন্নমত সম্মান করতে জানি না। এমন অনাকাক্সিক্ষত হতাহতের ঘটনার মধ্য দিয়ে জনগোষ্ঠী হিসেবে আমাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক মনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বিশ্বকাপ ফুটবলে।
বিশ্বকাপ ফুটবল দেখা কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে সিলেট, ঢাকা ও সাভারের আশুলিয়ায় পৃথক তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জকিগঞ্জে চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে এক যুবক, ঢাকার আদাবরে সালিশ বৈঠক শেষে কুপিয়ে এক বিএনপি নেতা এবং আশুলিয়ায় এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতের পর বালুচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া পতাকা লাগাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে মারা গেছেন তিনজন।
এক দিনে তিন খুন : সিলেটে জকিগঞ্জে বিশ্বকাপ কেন্দ্র করে গত ১ জুলাই কথাকাটাকাটির জেরে চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন আলম আহমদ (২৮) নামে এক যুবক। ঘটনার পর তার চাচাতো ভাই পারভেজ আহমদকে (৩২) গ্রেফতার করা হয়।
একই দিনে রাজধানীর আদাবরের নবোদয় হাউজিংয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা বাদশা মিয়া নিহত হয়েছেন। বুধবার রাতের এ ঘটনায় আহত হয়েছেন মো. সাদ্দাম হোসেন (৩৫) নামের আরেক বিএনপি নেতা। পুলিশ বলছে, বিশ্বকাপ ফুটবল কেন্দ্র করে এ হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানিয়েছে, গত সোমবার রাতে নবোদয় হাউজিংয়ে ব্রাজিল ও জাপানের ফুটবল খেলা কেন্দ্র করে দুপক্ষের মারামারি হয়।
এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়াতেও একই দিনে ব্রাজিল-জাপান ফুটবল ম্যাচ কেন্দ্র করে সমর্থকদের বিরোধের জেরে নাহিদ হাসান (১৫) নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার পর বালুচাপা দিয়ে মরদেহ গুমের ঘটনা ঘটে। গত ১ জুলাই বুধবার রাত ১২টার দিকে আশুলিয়ার সাধুপাড়া এলাকার গরুর হাটের বালুচর খুঁড়ে নিহত নাহিদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
সমাজ ও অপরাধ বিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, শুধু খেলাধুলা নয়, জাতি হিসেবে আমরা পরাজয় কিংবা অন্যের মতামত মেনে নেওয়ার মানসিকতা অর্জন করতে পারিনি। নিজের মতামত যেকোনোভাবেই হোক প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। যার ফলশ্রুতিতে অনেক ক্ষেত্রে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। আর এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই বিনোদনকে আমরা বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারছি না। যে বিষয়টি সহজ, সাধারণ শুধু বিনোদন হিসেবেই দেখা দরকার তার মধ্যে আমরা সীমাবদ্ধ থাকতে পারছি না। আমরা সবাই শুধু জয়ী হতে চাই। নিজের মতামত প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। পরাজিতের প্রতি শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধের প্রকাশের মানসিকতা আমাদেও মধ্যে নেই।
এ ক্ষেত্রে বিশ্বকাপ খেলাটা শুধু উপলক্ষ মাত্র। এই খেলার মধ্য দিয়ে জনগোষ্ঠী হিসেবে আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অপূর্ণ সুস্থতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিদ্যুৎস্পর্শে ৩ মৃত্যু : প্রতিবার বিশ্বকাপ ফুটবল কেন্দ্র করে পতাকা লাগাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এবারও তার ব্যতিক্রম হযনি। এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎস্পর্শে তিনটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত ১৯ জুন ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে বিশ্বকাপ উপলক্ষে গাছে ব্রাজিলের পতাকা লাগাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে নিহত হয় অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিন শেখ (১৪)। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে ব্রাজিলের পতাকা লাগানোর সময় বিদ্যুতায়িত হয়ে ফয়সাল (১৮) নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়।
চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানার লালদীঘির পাড় এলাকায় আর্জেন্টিনার পতাকা লাগাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে রামহরি বৈষ্ণব (২০) নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়। পতাকা লাগাতে গিয়ে আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে চট্টগ্রাম ও গাইবান্ধায়।
চট্টগ্রামে বাড়ির ছাদে আর্জেন্টিনার পতাকা লাগাতে গিয়ে মৌমাছির ঝাঁকের আক্রমণে আহত হন কর্ণফুলী উপজেলা আর্জেন্টিনা ফুটবল টিম সাপোর্টারস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম (৪২)।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে গত ১৩ জুন পর্তুগালের পতাকা লাগাতে কদমগাছে উঠে অজ্ঞান হয়ে পড়েন শামীম (৩০) নামের এক যুবক। পরে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করা হয়।
মারামারিতে আহত : বিশ্বকাপ ফুটবল কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষ সমর্থকের উচ্ছ্বাস ও আনন্দ মেনে নিতে না পেরে, প্রতিপক্ষ সমর্থকের কোনো খেলোয়াড়কে ব্যঙ্গ করা নিয়েও মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
গত ৯ জুন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সংঘর্ষে চারজন আহত হয়েছেন। লিওনেল মেসির ব্যঙ্গাত্মক ছবি দিয়ে ব্যানার টানানো কেন্দ্র করে লোহাগাড়া সদর ইউনিয়নের কালোয়ারপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
মারামারির ঘটনা ঘটেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। এতে শিক্ষক-ছাত্রসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। গত ২৯ জুন রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) জায়ান্ট স্ক্রিনে বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় তুচ্ছ কারণে ছাত্রদল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে দুদফা মারামারির ঘটনা ঘটে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টরসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। একই ঘটনায় ছাত্রশক্তি ও ছাত্রদলের দুই নেতাও মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
অতীত ঘটনার পুনরাবৃত্তি : সংবাদমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে দেশের শুধু খেলার এক মাসের মধ্যেই পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এবং ছাদ থেকে পড়ে কমপক্ষে সাতজন সমর্থক মারা যান। এ ছাড়া খেলা দেখা কেন্দ্র করে অন্য কারণসহ মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এর আগে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপেও হবিগঞ্জে রিয়াদ আহমেদ নামের এক কিশোর ঘরের ওপরে আর্জেন্টিনার পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এভাবে প্রতিটি বিশ্বকাপেই গড়ে ৫ থেকে ১০ জন মানুষ কেবল পতাকা টাঙাতে গিয়েই প্রাণ হারিয়েছেন।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে এ ধরনের ঘটনার পেছনে মানুষের ভেতরের দ্বৈত মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, সেই সঙ্গে আর্থসামজিক বৈষম্যের ফলে অবচেতন মনে সৃষ্ট ক্ষোভ ব্যক্তিবিশেষকে ক্রোধের চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে যায়। তাদের মতে, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের সঙ্গে আর্থসামাজিক বৈষম্যের সংঘাতের ফলে এসব ঘটনা ঘটছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও ছাত্র উপদেষ্টা ড. নূর মোহাম্মদ সময়ের আলোকে বলেন, মানুষের ভেতরে জন্মগতভাবে হোমোসাইড বা অন্যকে ধ্বংস করা এবং সুইসাইড বা নিজেকে ধ্বংস করার প্রবৃত্তি আছে।
এ ছাড়া প্রকৃতিগতভাবে সব মানুষের ভেতর জীবন প্রবৃত্তি বা নিজেকে রক্ষা করা এবং নিজেকে ধ্বংস করারও প্রবৃত্তি কাজ করে। আবার কখনো কখনো নিজের কিংবা পরিবারের যথেষ্ট সামজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক শক্তি সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিবিশেষে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা থাকে, যা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণকারীদের সঙ্গে তাকে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ফেলে।
এই মনোবিজ্ঞানীর মতে, আমাদের দেশে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা কেন্দ্র করেও এ ধরনের জটিল মানসিক বিষয়গুলো কাজ করে। বিশেষ করে আর্থসামজিক বৈষম্য, সেই সঙ্গে অনেক কিছুই না পাওয়ার যন্ত্রণা- এই সবকিছুর সঙ্গে জন্মগত বৈশিষ্ট্য তাকে পরমত অসহিষ্ণু করে তোলে। যার কারণে সবকিছু মিলিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সামান্য বিষয়গুলোও ব্যক্তিবিশেষকে ক্রোধের চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে যায়। যার ফলে এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটে।
এদিকে পুলিশ বলছে- খেলার জয়-পরাজয় নিয়ে সমর্থকদের উত্তেজনা এক পর্যায়ে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে পরিণত হচ্ছে। অনাকাক্সিক্ষত হত্যা বা হতাহত এড়াতে রাজধানীর পাড়া-মহল্লা বা বিভিন্ন জায়গায় বড় স্ক্রিনে খেলা দেখার স্থানগুলোয় বিশেষ নজরদারি করবে থানা পুলিশ ও ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
শুক্রবার বিকালে মিন্টো রোডের ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। জানানো হয়, ডিএমপির সব থানাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোথায় কোথায় এরকম স্ক্রিন আছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারাও লোক রাখবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও