ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল সমন্বয়ের নামে পকেট কাটা

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বা ‘ভুতুড়ে’ বিল নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ বাড়ছে দিন দিন। তাদের দাবি, প্রতি মাসে যে

2026-07-05T00:33:18+00:00
2026-07-05T00:33:18+00:00
 
  রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
ভূতুড়ে বিদ্যুৎ বিল সমন্বয়ের নামে পকেট কাটা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩৩ এএম 
ভুতুড়ে বিল নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ বাড়ছে দিন দিন। গ্রাফিক : সময়ের আলো
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বা ‘ভুতুড়ে’ বিল নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ বাড়ছে দিন দিন। তাদের দাবি, প্রতি মাসে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, জুন মাসের বিলে তার তুলনায় অনেক বেশি ইউনিট দেখানো হয়েছে। 

অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, বছরের অন্য সময় এমনটি না হলেও জুন ক্লোজিংয়ের আগে প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের পরিবর্তে অনুমানভিত্তিক বা অতিরিক্ত ইউনিট দেখিয়ে বিল করা হয়। যদিও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো বরাবরের মতো এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সিজা রহমানের অভিযোগ, সাধারণত তার মাসিক বিদ্যুৎ খরচ দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু জুন মাসে এসে সেই খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘এটা পুরোপুরি একটা ভূতুড়ে ব্যাপার মনে হচ্ছে। এমনটা আগে কখনো হয়নি।’

মতিঝিলের চাকরিজীবী আইনাল হোসেন বলেন, এর আগেও জুন মাসে অতিরিক্ত বিল এসেছে। অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। পুরো বিলই পরিশোধ করতে হয়েছে। এ বছরও অতিরিক্ত ৩ হাজার টাকা এসেছে। এবারও অভিযোগ দিয়েছি, কাজ হবে কি না জানি না। বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের কাছে থেকে অন্যায়ভাবে বেশি টাকা আদায় করছে। সরকার সংশ্লিষ্টরা আশ্বাস দিলেও আদতে কোনো কাজ হচ্ছে না।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বিল প্রণয়নে কোনো করণিক বা কারিগরি ভুল হয়ে থাকলে তা দ্রুত সংশোধন করা হবে। পাশাপাশি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সমস্যা সমাধানে গ্রাহকদের হটলাইন অথবা সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অনেক এলাকায় প্রিপেইড ও স্মার্ট মিটার চালু হলেও এখনও বিপুলসংখ্যক গ্রাহক পুরোনো পোস্টপেইড মিটারের ওপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্মার্ট মিটারের ব্যবহার বাড়লে মিটার রিডিং নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক অনেকটাই কমে আসবে।

অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থার সঙ্গে সরাসরি অথবা হটলাইনের মাধ্যমে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কেন্দ্রীয় সেবা হটলাইন ১৬৯৯৯ ছাড়াও বিপিডিবি (১৬২০০), পল্লী বিদ্যুৎ (১৬৮৯৯), বিপিডিসি (১৬১১৬), ডেসকো (১৬১২০), নেসকো (১৬৬০৩) এবং ওজোপাডিকো (১৬১১৭) নম্বরে অভিযোগ জানানো যাবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের আলোকে বলেন, অতিরিক্ত বিলের ক্ষেত্রে পরে সমন্বয় করা হয়। এতে অতিরিক্ত অর্থ আত্মসাৎ বা ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সমন্বয় হলেও অতিরিক্ত ইউনিটের কারণে কোনো গ্রাহক যদি উচ্চতর স্ল্যাবে চলে যান, তা হলে সেই অতিরিক্ত অর্থ আর ফেরত পান না।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রায় প্রতি বছরই একই ধরনের ঘটনা ঘটে। বছরের অন্য সময় দুই থেকে তিন হাজার টাকা বিল এলেও জুনে পাঁচ থেকে আট হাজার টাকার বিল এসেছে। এ বিষয়ে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিস সন্তোষজনক ব্যাখ্যা বা কার্যকর সমাধান দিচ্ছে না। কেউ কেউ মিটার পরীক্ষার আবেদন করলেও সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে।

অনেক এলাকায় নিয়মিত মিটার রিডিংও নেওয়া হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একসঙ্গে দুই মাসের রিডিং নেওয়া হয়। আবার কোথাও অনুমানভিত্তিক বিল তৈরি করা হয়। ফলে প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে বিলের কোনো মিল থাকে না। পরে সংশোধনের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে গ্রাহকদের দীর্ঘ ভোগান্তি পোহাতে হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মচারী সময়ের আলোকে জানান, অর্থবছরের শেষ দিকে বিভিন্ন হিসাব সমন্বয়ের জন্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত বিল তৈরির অলিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর ফলে অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে জুন ক্লোজিংয়ের সময় অতিরিক্ত মিটার রিডিং দেখিয়ে বিল প্রস্তুত করা অনেক ক্ষেত্রে নিয়মে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে দেশে প্রায় পাঁচ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) গ্রাহক প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ৫৮ হাজার। মোট গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৫৫ লাখ প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করেন। এসব গ্রাহকের ক্ষেত্রে মিটারে ত্রুটি না থাকলে অতিরিক্ত বিলের সুযোগ কম। তবে বাকি বিপুলসংখ্যক পোস্টপেইড গ্রাহকের ক্ষেত্রেই মূলত অনিয়মের অভিযোগ বেশি। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিদ্যুৎ অপচয় ও চুরির কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত সিস্টেম লস কম দেখাতে অনেক সময় গ্রাহকদের ওপর বাড়তি বিলের চাপ সৃষ্টি করা হয়। পাশাপাশি জুন ক্লোজিংয়ের আগে বকেয়া কম দেখানো, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং মিটার রিডারদের গাফিলতির কারণেও প্রতিবছর অনেক গ্রাহক ভোগান্তির শিকার হন।

বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সিস্টেম লস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ প্রযুক্তিগত কারণে এবং আরেকটি অংশ চুরি, অবৈধ সংযোগ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে নষ্ট হয়। এ ক্ষতি যত কমানো যায়, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাও তত ভালো থাকে। তবে সিস্টেম লস কমানোর নামে গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত বিল চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একাধিক কর্মকর্তা সময়ের আলোকে জানান, গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ বিদ্যুৎ লাইনের কারণে স্বাভাবিকভাবেই সিস্টেম লস তুলনামূলক বেশি হয়। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিও এর জন্য দায়ী। ফলে আয়-ব্যয়ের সমন্বয় এবং সিস্টেম লস কম দেখাতে জুন ক্লোজিংয়ের আগে বাড়তি বিল করার জন্য মৌখিক চাপ দেওয়া হয়। কোনো কোনো মিটার রিডার বা কর্মকর্তা জুন মাসে একবারে বেশি ইউনিট না দেখিয়ে কয়েক মাস ধরে অল্প অল্প করে অতিরিক্ত ইউনিট যোগ করেন, যাতে গ্রাহক বিষয়টি বুঝতে না পারেন। পরে তা সমন্বয় করা হয়।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের দাবি, অতিরিক্ত বিল করার কোনো নীতিগত সুযোগ নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিটার রিডিংয়ের ভুল, অনুমানভিত্তিক বিল অথবা আগের মাসের সমন্বয়ের কারণে বিল বেশি হতে পারে। অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিলিং ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। মিটার রিডিংয়ের ছবি সংরক্ষণ, অনলাইনে রিডিং যাচাইয়ের সুযোগ, অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা চালু করা গেলে এ ধরনের অভিযোগ অনেকাংশে কমে আসবে।

ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, বিতরণ সংস্থাগুলোতে সিস্টেম লস কমানোর এ অপকৌশল সম্পর্কে অনেকেই জানেন। কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নেয় না। বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন দরকার। কারণ বিদ্যুৎ খাতে সেবা দেওয়ার পরিবর্তে লুণ্ঠন হচ্ছে। মিটার রিডিং ও বিল তৈরির পুরো প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল ও লোডশোডিং প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, কয়েক জায়গায় বিদ্যুৎ বিল নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। আমরা প্রতিটি বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ সেন্টার করেছি। সেখানে যোগাযোগ করে সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছি। এ নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জুনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ জানিয়েছেন, বিল প্রণয়নে কোনো করণিক বা কারিগরি ভুল হয়ে থাকলে তা দ্রুত সংশোধন করতে হবে। পাশাপাশি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   ভূতুড়ে  বিদ্যুৎ  বিল  সমন্বয়  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: