জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতদের ন্যায়বিচার এদেশের মাটিতেই হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘তবে বিচারের নামে কারো প্রতি যেন অবিচার না হয়। এ বিষয়ে অবশ্যই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। একটু বিলম্ব হোক তবুও অন্যায়কারীর যেন সঠিক বিচার হয়। আমরা সেই চেষ্টাই করব।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি সব সময় বলে থাকি, ৫ আগস্ট যে অর্জন আমরা করেছি, এই অর্জন কোনো একক ব্যক্তি, কোনো একক রাজনৈতিক দলের অর্জন নয়; বরং এই অর্জন দল-মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গণতন্ত্রকামী শান্তিপ্রিয় মানুষের অর্জন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শনিবার দুপুরে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ঢাকার আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি এবং আমরা জুলাই যোদ্ধা’। অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এতে নিজের বক্তব্যে দেশকে এগিয়ে নিতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা দরকার বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন। আজ আমাদের হাতে সেই সুযোগটি এসেছে। আমরা চাই না জাতিকে দ্বিধা বিভক্ত করে সামনে এগিয়ে যেতে। কারণ জাতিকে বিভক্ত করে দেশকে কখনো সামনে নেওয়া যায় না। দেশকে সামনে একমাত্র তখনই নেওয়া সম্ভব যদি আমরা সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারি।
তারেক রহমান বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ৬৫ জন শিশু সেদিন শহিদ হয়েছিল। তাদের কি কোনো অপরাধ ছিল? তাদের অপরাধ ছিল না। কিন্তু দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করতে গিয়ে যেভাবেই হোক এই শিশুগুলো সেদিন জীবন দিয়েছে।
সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করে গিয়েছেন যে, জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ১৪০০ মানুষ সেদিন শহিদ হয়েছিলেন। সেই উত্তাল দিনগুলোতে যতটুকু সম্ভব হয়েছে আমার পক্ষে বিভিন্নভাবে শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও বিভিন্নভাবে খোঁজ করছিলাম আমার নেতাকর্মীদের মাধ্যমে। অনেকে অনেক হিসাব দিয়েছে। কিন্তু আমার হিসাবে, শুধু জুলাই আন্দোলনেই শহিদ হয়েছে ২ হাজারের মতো মানুষ, ৩০ হাজারের মতো মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সার্বিকভাবে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন, মামলা-হামলার বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আপনজনকে আপনারা হারিয়েছেন, তারও তো লক্ষ্য ছিল এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন। তারও তো লক্ষ্য ছিল-এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন, এই দেশের মানুষের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা।
জুলাই বিপ্লবের শহিদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি প্রথমেই বলেছি রাষ্ট্র দেশ তার যথাসাধ্য দিয়ে আপনাদের মূল্যায়নের চেষ্টা করবে, আপনাদের আত্মত্যাগকে মূল্যায়ন করবে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, শুধু আমার দলেরই নয়, অন্য আরও রাজনৈতিক দল এবং একই সঙ্গে যেসব অরাজনৈতিক ব্যক্তি-যারা ৫ আগস্ট (ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন আন্দোলন) সফল করেছিলেন, তাদের সবার কাছে বলতে চাই যে, দেশের লক্ষ কোটি মানুষের প্রতি স্বৈরাচার যেমন অবিচার করেছিল, বিচারের নামে কারও প্রতি যেন অবিচার না হয়, সে বিষয়টিতেও আমাদের সচেতন থাকতে হবে।
অনুষ্ঠানে জুলাই বিপ্লবের শহিদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শহিদ মিরাজ হোসেনের বাবা আবদুর রব মিয়া, শহিদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, জুলাই বিপ্লবের আহত আল মিরাজ এবং আমিনুল ইসলাম ইমনের হাতে ‘স্মৃতি স্মারক’ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত শহিদ পরিবারের সদস্যদের কাছে স্মৃতি স্মারক পৌঁছে দেওয়া হয়।
জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সভাপতি আবু হুরায়রা, কওমি ছাত্র ফোরামের সভাপতি জামিল সিদ্দিকী, আয়োজক সংগঠন ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’র সভাপতি আমিনুল ইসলাম ইমন, সাধারণ সম্পাদক আল মিরাজ, ‘শহিদ ২৪ শহিদ পরিবার সোসাইটি’র সভাপতি গোলাম রহমান ও সাধারণ সম্পাদক রবিউল আওয়াল।
জুলাই বিপ্লবে শহিদদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেইন, শহিদ শাহরিয়ার হোসেন আলভীর বাবা আবুল হোসেন, শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ্জোহরা, শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা শফিউল আলম এবং যাত্রাবাড়ীতে শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আবদুর রব মিয়া।
জুলাই বিপ্লবে আহত শাহিন মালু, সুজন মোল্লা, মিল্লাত হোসেন, আল-আমীন ও মেহেদি হাসান মিরাজ তাদের মনোবেদনার কথা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন।
সম্মেলনে রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাই কমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/এসএকে