দেশে দেশে গণহত্যা বন্ধ করতে জাতিসংঘ কেন ব্যর্থ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

বিশ্বজুড়ে একের পর এক মানবিক সংকট ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাঝেও দেশে দেশে গণহত্যা বন্ধ করতে জাতিসংঘের ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র

2026-07-07T06:01:08+00:00
2026-07-07T06:01:29+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬,
২৩ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
দেশে দেশে গণহত্যা বন্ধ করতে জাতিসংঘ কেন ব্যর্থ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬, ৬:০১ এএম  আপডেট: ০৭.০৭.২০২৬ ৬:০১ এএম
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে 'গণহত্যা বন্ধ করুন' লেখা একটি ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভকারীরা। ছবি : এএফপি
বিশ্বজুড়ে একের পর এক মানবিক সংকট ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাঝেও দেশে দেশে গণহত্যা বন্ধ করতে জাতিসংঘের ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন এবং সুদানের দারফুরে আরএসএফ বাহিনীর জাতিগত নির্মূল অভিযানের মতো ঘটনাগুলোতে বিশ্ব সংস্থাটির নিষ্ক্রিয়তা ও সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। 

এই প্রেক্ষাপটেই গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধে বিভিন্ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একটি পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে অতীতের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করে পর্যবেক্ষকরা সন্দিহান যে, এই আলোচনা বাস্তবে ভুক্তভোগী মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে কি না।

জাতিসংঘের সংজ্ঞা ও আইনি ভিত্তি

ঐতিহাসিকভাবে, ১৯৪৪ সালে পোলিশ আইনজীবী রাফায়েল লেমকিন প্রথম ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এটিকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ১৯৪৮ সালের ‘গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি বিষয়ক সনদ’ বা ‘গণহত্যা সনদ’-এর মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিধিবদ্ধ করে, যা ১৯৫১ সালে কার্যকর হয়। 

জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী— কোনো জাতীয়, নৃতাত্ত্বিক, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে হত্যা, গুরুতর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতিসাধন, ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিকূল জীবনযাত্রার পরিস্থিতি চাপিয়ে দেওয়া কিংবা জন্মরোধের মতো পদক্ষেপ নেওয়া গণহত্যার শামিল। 

ব্যর্থতার মূল কারণ ও ভূ-রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ

এই স্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা থাকার পরও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, ভূ-রাজনীতি এবং নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে জাতিসংঘ বারবার গণহত্যা রুখতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসংঘের যে-কোনো বড় ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের হাতে। কিন্তু এর পাঁচ স্থায়ী সদস্যের (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন) ‘ভেটো’ ক্ষমতার কারণে যে-কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আটকে যায়। ফলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। এছাড়া আন্তর্জাতিক আদালতগুলোতে গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় চলমান অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা যায় না।

রুয়ান্ডা গণহত্যা (১৯৯৪)

মাত্র ১০০ দিনে রুয়ান্ডার সংখ্যাগরিষ্ঠ হুতু সম্প্রদায়ের হাতে প্রায় ৮ লাখ তুতসি ও মধ্যপন্থী হুতু নাগরিক নিহত হন। বিশ্ব নেতারা এই নৃশংসতার খবর জানলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে জাতিসংঘ ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করা থেকে বিরত ছিল এবং সৈন্য পাঠাতে বিলম্ব করে। তৎকালীন জাতিসংঘ প্রধান বান কি-মুন পরবর্তীতে এই ব্যর্থতার জন্য বিশ্ব সংস্থাকে "লজ্জিত" বলে উল্লেখ করেন। যদিও পরে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ৬১ জন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা (২০২৩-বর্তমান)

২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গাজা উপত্যকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও হাজার হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যু সত্ত্বেও জাতিসংঘ কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে পারেনি। জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত এবং বিশেষ র‍্যাপোর্টার ফ্রান্সেসকা আলবানিজের রিপোর্টে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে ‘গণহত্যার সুস্পষ্ট লক্ষণ’ পাওয়া গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ও সামরিক সহায়তার কারণে জাতিসংঘ এখানে দৃশ্যত অসহায় ভূমিকা পালন করছে। পশ্চিমা দেশগুলো এখনো ইসরায়েলকে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে যাচ্ছে।

স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা (১৯৯৫)

বসনিয়া যুদ্ধের শেষ দিকে সার্ব বাহিনী জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নিরাপদ অঞ্চল’ স্রেব্রেনিৎসায় প্রবেশ করে ৮ হাজারেরও বেশি বসনিয়াক মুসলিম পুরুষ ও বালককে হত্যা করে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী সেখানে উপস্থিত থেকেও এই হত্যাযজ্ঞ ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ২০১৫ সালে এই ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রস্তাবে রাশিয়া ভেটো দেয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে জাতিসংঘ ১১ই জুলাইকে স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্মরণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।



সুদানের দারফুরে গণহত্যা

২০২৩ সাল থেকে সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফ-এর মধ্যে চলা যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বিশেষ করে দারফুরের আল-ফাশের শহরে আরএসএফ বাহিনীর বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল ও গণহত্যার সুস্পষ্ট অভিযোগ তুলেছে জাতিসংঘেরই স্বাধীন তথ্য-অনুসন্ধানকারী মিশন। কিন্তু আন্তর্জাতিক আদালতের এখতিয়ার সংকট এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় শক্তির অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ সত্ত্বেও ভূ-রাজনৈতিক নীরবতার কারণে এই নৃশংসতা থামানো যাচ্ছে না।

উইঘুর জনগণের বিরুদ্ধে চীনের গণহত্যা

শিনজিয়াং প্রদেশে লাখ লাখ উইঘুর মুসলিমকে তথাকথিত পুনঃশিক্ষা শিবিরে আটকে রাখা এবং তাদের ওপর নির্যাতন চালানোর বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ ও গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। তবে চীন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ায় এবং এই অভিযোগগুলোকে শুরু থেকেই ‘চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই’ বলে প্রত্যাখ্যান করায় জাতিসংঘ বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যা (২০১৭)

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের মুখে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘ এই অভিযানকে জাতিগত নির্মূলের পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ বললেও নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার বন্ধুভাবাপন্ন অবস্থান এবং ভেটো ক্ষমতার কারণে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। গাম্বিয়ার দায়ের করা গণহত্যার মামলাটি এখনো আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, যতদিন পর্যন্ত ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে একপাশে রেখে অপরাধী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে একযোগে দাঁড়ানোর মতো বৈশ্বিক সংস্কার সাধন না হবে, ততদিন পর্যন্ত এই আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা ও জাতিসংঘ কাগজে-কলমে আলোচনা করলেও বাস্তবে গণহত্যা রোধে ব্যর্থ হতেই থাকবে।

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   দেশ  গণহত্যা  বন্ধ  জাতিসংঘ  ব্যর্থ 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: