বন্ধ কারখানা চালুতে অর্থায়ন পাবে না খেলাপি গ্রহীতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ কিংবা আংশিকভাবে চালু থাকা শিল্প ও সেবা খাতকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি

2026-07-08T04:22:11+00:00
2026-07-08T04:22:11+00:00
 
  বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬,
২৪ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
অর্থনীতি
বন্ধ কারখানা চালুতে অর্থায়ন পাবে না খেলাপি গ্রহীতা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬, ৪:২২ এএম 
বন্ধ কারখানা চালুতে অর্থায়ন পাবে না খেলাপি গ্রহীতা। সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ কিংবা আংশিকভাবে চালু থাকা শিল্প ও সেবা খাতকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০ হাজার কোটি টাকার প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম বাস্তবায়নে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে তফসিলি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে অংশগ্রহণ চুক্তি সম্পাদনের বিস্তারিত শর্ত, দায়িত্ব ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে সার্কুলার জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট-৩ (বিআরপিডি-৩) এ সংক্রান্ত সার্কুলার লেটার জারি করে। এর সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণ চুক্তির খসড়া, অনুমোদনপত্র, ডেবিট অথরিটি, লেটার অব কন্টিনিউটি এবং প্রমিসরি নোটের নমুনাও সংযুক্ত করা হয়েছে। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, গত ৪ জুন বিআরপিডির জারি করা সার্কুলার অনুযায়ী গঠিত ২০ হাজার কোটি টাকার ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়তাবিষয়ক প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’ বাস্তবায়নে এই চুক্তি বাধ্যতামূলক। যেকোনো তফসিলি ব্যাংক এই স্কিম থেকে অর্থ নিতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে অংশগ্রহণ চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে।

এ স্কিমের মূল উদ্দেশ্য হলো- পর্যাপ্ত কার্যকরী মূলধনের অভাবে বন্ধ অথবা আংশিকভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় সচল করা। বিশেষ করে রফতানিমুখী শিল্প এবং সেবা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যাতে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান রক্ষা এবং রফতানি আয় বাড়ানো সম্ভব হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, কেবল বড় শিল্প ও সেবা খাতের এমন প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাবে, যেগুলো কার্যকরী মূলধনের অভাবে বন্ধ বা সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পেলে পুনরায় উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।

তবে খেলাপি ঋণগ্রহীতা কোনো প্রতিষ্ঠান এই স্কিমের আওতায় অর্থায়নের সুযোগ পাবে না। পাশাপাশি অর্থ পাচার, জালিয়াতি, তহবিল অপব্যবহার বা অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকলে তাদের এই স্কিমের আওতায় অর্থায়ন দেওয়া যাবে না। 

এ বিষয়ে যথাযথ যাচাইয়ের মূল দায়িত্ব থাকবে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের ওপর। তবে ঋণ অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা, কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, বিপণন সমস্যা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং ইউটিলিটি-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের প্রত্যয়নপত্রও সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

তহবিলের নির্দিষ্ট ব্যবহার 

স্কিমের অর্থ শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে ব্যবহার করা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ ইউটিলিটি বিল, কাঁচামাল ক্রয়, রফতানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং উৎপাদন ব্যয় মেটানো।

তহবিল থেকে সর্বোচ্চ চার মাসের বেতন-ভাতা দেওয়া যাবে এবং তা অবশ্যই ব্যাংক হিসাব অথবা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (গঋঝ) মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নগদ অর্থ প্রদান করা যাবে না। এ ছাড়া চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, এই তহবিল ব্যবহার করে কোনো প্রতিষ্ঠানের পুরোনো ঋণ সমন্বয় বা পরিশোধ করা যাবে না। এটি শুধু নতুন কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন মেটানোর জন্য ব্যবহার হবে। প্রয়োজনে অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে ব্যাংকের প্রতিনিধি বা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিতে পারবে ব্যাংক।

ঋণের সীমা, মেয়াদ ও সুদের হার

এই স্কিমের আওতায় একজন ঋণগ্রহীতা বা একটি গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা পেতে পারবে। ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর। তবে ঋণগ্রহীতার লেনদেন সন্তোষজনক হলে এবং তহবিলে অর্থ থাকলে তা নবায়ন করার সুযোগ রয়েছে।

গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হারও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অংশগ্রহণকারী ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ বা মুনাফা নিতে পারবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই ব্যাংকের কাছ থেকে ৪ শতাংশ হারে সুদ বা মুনাফা আদায় করবে। ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য একটি নির্দিষ্ট মার্জিন থাকবে।

অনুমোদন ও কঠোর নজরদারি

প্রি-ফাইন্যান্স সুবিধা পাওয়ার জন্য ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ঋণ অনুমোদনের সাত দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি-৩ বিভাগে আবেদন জমা দিতে হবে। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে অর্থ ছাড় করবে এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।

ঋণ বিতরণ ও আদায়ের অগ্রগতি সম্পর্কেও কঠোর নজরদারির বিধান রাখা হয়েছে। অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে প্রতি প্রান্তিক শেষে পরবর্তী মাসের ১০ তারিখের মধ্যে ঋণ বিতরণ ও আদায়ের প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে। ঋণগ্রহীতা নির্বাচন, জামানত গ্রহণ, ঋণ বিতরণ, তদারকি এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার পূর্ণ দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওপর।

আরও পড়ুন

প্রয়োজন হলে ব্যাংক কার্যকরী মূলধনের বিপরীতে জামানতও গ্রহণ করতে পারবে। একই সঙ্গে একক ঋণগ্রহীতা সীমা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যান্য বিধানও অনুসরণ করতে হবে। ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক এবং প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখাগুলোও নিজস্ব বিনিয়োগ নীতিমালা অনুসরণ করে এই স্কিমের আওতায় অর্থ নিতে পারবে।

চুক্তির অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোকে ডিমান্ড প্রমিসরি নোট, ডেবিট অথরিটি এবং লেটার অব কন্টিনিউটির মতো আইনগত দলিলে স্বাক্ষর করতে হবে, যাতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হিসাব থেকে মূল অর্থ, সুদ বা অন্যান্য পাওনা সমন্বয় করতে পারে।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বন্ধ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে কার্যকরভাবে এই স্কিম বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রফতানি আয় বৃদ্ধিতে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 



  বিষয়:   বন্ধ কারখানা  চালু  অর্থায়ন  খেলাপি  গ্রহীতা 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: