একটানা মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণে বান্দরবানে পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলার সাত উপজেলার পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী কয়েক হাজার পরিবার এখন ঝুঁকিতে রয়েছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
টানা বৃষ্টিতে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা এবং পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য দুর্যোগের আশঙ্কায় মঙ্গলবার থেকে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ভারী বৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই পর্যটক ও জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সময় জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র, ঝরনা, পাহাড়ি ট্রেইল, নদীপথ এবং দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পর্যটক, ট্যুর অপারেটর ও সাধারণ মানুষের ভ্রমণ নিষিদ্ধ থাকবে। সবাইকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলার সাত উপজেলার পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বান্দরবানের মৃত্তিকা ও পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত পাহাড় কাটার কারণে পাহাড়ের ওপরের মাটির স্তর সরে গিয়ে ভেতরের নরম অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। এতে ভূমিক্ষয়ের মাধ্যমে পাহাড়ে ফাটল সৃষ্টি হয়। ভারী বর্ষণে সেই ফাটলে পানি প্রবেশ করলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
বান্দরবান পৌর প্রশাসক মঞ্জুর আলম বলেন, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ধস ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পৌর প্রশাসন সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টানা অতিবৃষ্টিতে বান্দরবানের থানচি উপজেলার সাঙ্গু নদী ও পাহাড়ি ছড়াগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় তিন্দু, রেমাক্রী ও নাফাখুম এলাকায় পর্যটকদের ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ায় দুর্গম এসব এলাকায় অর্ধশতাধিক পর্যটক আটকে পড়েন।
এ বিষয়ে থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটক ও গাইডদের এসব এলাকায় ভ্রমণ ও নৌযান চলাচল থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দুর্গম নাফাখুম জলপ্রপাত এলাকায় ভ্রমণে গিয়ে ৬৯ জন পর্যটক ও ১০ জন ট্যুরিস্ট গাইড টানা ভারী বৃষ্টির কারণে আটকা পড়েন। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় মঙ্গলবার সকালে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলে তারা নিরাপদে রেমাক্রী বাজারে পৌঁছান। তবে নদীর স্রোত এখনও স্বাভাবিক না হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে তারা থানচি সদরে ফিরতে পারেননি। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইফ জ্যাকেট পাঠানো হয়েছে। আটকে পড়া সব পর্যটক ও গাইড সুস্থ রয়েছেন।
কয়েক দিন ধরে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় উজান থেকে নেমে আসা পানিতে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে অনেক এলাকায় স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হতে শুরু করেছে।
বান্দরবান প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সনাতন কুমার মণ্ডল জানান, মঙ্গলবার বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা অতিভারী বৃষ্টিপাতের মধ্যে পড়ে। বুধবারও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। জেলা সদরসহ সাতটি উপজেলায় মোট ২২০টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকা এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বান্দরবান সদর উপজেলার ক্যংচিংঘাটা, কালাঘাটা, কাসেমপাড়া, ইসলামপুর, বনরূপাপাড়া, হাফেজঘোনা, বাসস্টেশন এলাকা, স্টেডিয়াম এলাকা, নোয়াপাড়া ও কসাইপাড়াসহ জেলার সাত উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিতভাবে কয়েক হাজার পরিবার বসবাস করছে। টানা বর্ষণে পাহাড়ি মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় যেকোনো সময় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও মাঝেমধ্যে ভারী বৃষ্টির কারণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু নদীর পানি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। বান্দরবান পৌর এলাকার পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী কালাম, রহিম ও হাসানসহ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের নিচে বসবাস করছেন। নিম্নআয়ের মানুষ হওয়ায় বাধ্য হয়ে কম দামে পাহাড়ের জমি কিনে সেখানে বসতি গড়েছেন। ঝুঁকি সম্পর্কে জানলেও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে বর্ষা এলেই তাদের আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে বান্দরবান পৌর শহরের বালাঘাটা ক্যান্টনমেন্ট সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে হাঁটুর সমান পানি জমে থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও যানবাহনের চালকরা। বালাঘাটা ক্যান্টনমেন্ট সড়কে জমে থাকা পানির কারণে পথচারীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। যানবাহনের সংকটে অনেক স্কুলগামী শিক্ষার্থীকে হাঁটুপানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে তাদের পোশাক ও জুতা ভিজে যাচ্ছে। ছোট যানবাহন ও মোটরসাইকেল চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় প্রতিদিনের যাতায়াতে স্থানীয়দের অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।
বান্দরবান ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী রনবীর বড়ুয়া ও জর্জ তংচঙ্গ্যা বলেন, আজ (মঙ্গলবার) সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় রাস্তায় তেমন একটা জলাবদ্ধতা ছিল না। কিন্তু স্কুল ছুটির পর বাসায় ফেরার সময় হাঁটুসমান পানি জমে যায়। পানি পার হতে গিয়ে প্যান্ট ও জুতা পুরোপুরি ভিজে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা অংক্যচিং মারমা ও মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে বালাঘাটা সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাটি নিচু হওয়ায় প্রায়ই এখানে পানি জমে থাকে। আরও কয়েক দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এ সড়কে চলাচলে আরও দুর্ভোগ বাড়বে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি