নড়াইল জেলার বিভিন্ন এলাকায় গত এক দশকে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অন্তত পাঁচ শতাধিক শতবর্ষী প্রাচীন গাছ কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশবাদী ও স্থানীয়দের দাবি, জেলার বিভিন্ন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খাসজমি, গ্রামীণ জনপদ এবং নদ-নদীর তীরজুড়ে থাকা এসব প্রাচীন গাছ কেটে ফেলার ফলে নড়াইল অঞ্চলের পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
বর্তমানেও জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে অর্ধশতাধিক বিভিন্ন প্রজাতির গাছ টিকে থাকলেও, সেগুলো সংরক্ষণে বন বিভাগের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। দ্রুত এসব গাছের তালিকা তৈরি করে তা সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বৃক্ষপ্রেমীরা। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসন বলছে, অচিরেই তারা গাছগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেবে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, এক সময়কার অবিভক্ত ভারতের প্রাচীন মহকুমা বর্তমান নড়াইল জেলা। নদী ও বিলবেষ্টিত এই জনপদ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির এক অনন্য সমন্বয়। মুঘল আমলের শেষের দিকে এবং জমিদারি শাসনের সময়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বসবাস শুরু করেন হিন্দু জমিদাররা। পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও ছায়াময় আবাস গড়ে তোলার জন্য তৎকালীন জমিদার ও বাবুরা রোপণ করেছিলেন অসংখ্য বৃক্ষ।
সময়ের পরিক্রমায় জমিদাররা দেশ ছেড়ে চলে গেলেও গাছগুলো টিকে ছিল। কিন্তু গত এক দশকে সড়ক উন্নয়নসহ বিভিন্ন অজুহাতে কেটে ফেলা হয়েছে ৫ শতাধিক শতবর্ষী গাছ। এই জনপদের বিভিন্ন এলাকায় ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল আকৃতির তেঁতুল, আম, গাব, হিজল, পাকুড়, বটবৃক্ষসহ কয়েক প্রজাতির অর্ধশতাধিক বৃক্ষ। শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া এসব বৃক্ষ জেলার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও সরকারি অথবা বেসরকারিভাবে এগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। এমনকি জেলায় কতগুলো শতবর্ষী গাছ আছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্যও নেই স্থানীয় বন বিভাগের কাছে।
এ বিষয়ে নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান কেয়া রেণু রায় বলেন, একটি শতবর্ষী গাছ তৈরি হতে শত বছর সময় লাগে। কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি কেটে ফেলা হয়। এসব গাছ কেবল অক্সিজেন দেয় না, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি অসংখ্য পাখি, প্রাণী ও কীটপতঙ্গের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে।
নড়াইল সামাজিক বনায়ন নার্সারি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ফরেস্ট রেঞ্জার (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) কাজী ইশতিয়াক রহমান জানান, তিনি কর্মস্থলে নতুন এসেছেন। বর্তমানে নড়াইলে শতবর্ষী গাছের কোনো তালিকা বন বিভাগের কাছে নেই। তবে দ্রুত গাছগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে সেগুলো সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
নড়াইলের জেলা প্রশাসক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল ছালাম বলেন, জেলার শতবর্ষী গাছগুলো সংরক্ষণ করা হবে। এ ব্যাপারে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে। আপাতত নড়াইল সদর, কালিয়া ও লোহাগড়া উপজেলার তিনটি গাছের চারপাশে ইটের গাঁথুনি দিয়ে পথচারী ও এলাকাবাসীর জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন গাছগুলো নিজ নিজ উদ্যোগে সংরক্ষণ করার আহ্বান জানান তিনি।
পরিবেশবিদরা বলছেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শতবর্ষী গাছের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু পরিকল্পনার অভাব ও অবহেলায় একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে এসব প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। অবশিষ্ট গাছগুলো দ্রুত সংরক্ষণ করা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এগুলো কেবল স্মৃতি হয়েই রয়ে যাবে।
নড়াইলের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিক আজিজুল ইসলাম বলেন, এসব বৃক্ষকে শুধু পরিবেশগত সম্পদ হিসেবে নয়, জেলার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এই শতবর্ষী বৃক্ষগুলো শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, তারা আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের ধারক।
নড়াইল প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তারিক আলম বলেন, এসব গাছ প্রকৃতপক্ষে একটি অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নীরব দলিল। এই জনপদের এসব ঐতিহাসিক বৃক্ষের বেশিরভাগই আজ ঝুঁকির মুখে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইলের সভাপতি মো. শাহ আলম বলেন, গত ১০ বছরে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এর জন্য দায়ী নড়াইলের বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তারা। গাছ কাটার ফলে পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে এখনও যে গাছগুলো আছে, সেগুলো দ্রুত তালিকা করে সংরক্ষণ করার দাবি জানাচ্ছি।
পরিবেশপ্রেমীরা জানান, বিভিন্ন সময় বন অধিদফতর থেকে ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সি বৃক্ষের তালিকা তৈরির জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও এ বিষয়ে উদাসীন নড়াইল বন বিভাগ।
প্রশাসন থেকেও গাছগুলো সংরক্ষণের দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রমের তথ্য মেলেনি। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, টিকে থাকা গাছগুলোর মধ্যে বেশ কিছু গাছের বয়স অন্তত দুইশ বছর।
নড়াইল পৌর এলাকার মহিষখোলা গ্রামের বৃক্ষপ্রেমী যাযাবর মনির বলেন, শতবর্ষী বৃক্ষ শুধু একটি গাছ নয়, এটি একেকটি জীবন্ত ইতিহাস। একসময় এই গাছের ছায়াতেই হতো গ্রামের সালিশ-বিচার, সামাজিক বৈঠক ও নানা জনকল্যাণমূলক আয়োজন। কোনো কোনো গাছের নিচে বসেই শিল্পীরা এঁকেছেন ছবি, কবিরা লিখেছেন কবিতা, গীতিকাররা রচনা করেছেন গান।
লোহাগড়া উপজেলার ইতনা এলাকার বাসিন্দা হাসান মাহমুদ বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবহেলা, ভূমি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন এবং সচেতনতার অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে জেলার বহু পুরোনো বৃক্ষ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি