চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপকূলে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেড়িবাঁধ অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের তোড়ে সাগরগর্ভে ধসে পড়েছে। নির্মাণের মাত্র ৪ বছরের মাথায় এই স্থায়ী বেড়িবাঁধ সাগরে বিলীন হতে চলায় উপকূলীয় এলাকার মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র আতঙ্ক।
টানা বর্ষণ ও বঙ্গোপসাগরের প্রবল জোয়ারের প্রভাবে খানখানাবাদ ইউনিয়নের কদমরসুল ও প্রেমাশিয়া এলাকার বাঁধটি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বেশ কয়েকটি স্থানে বাঁধ উপচে লোকালয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার খানখানাবাদ, সাধনপুর, বাহারছড়া, সরল, গণ্ডামারা, শেখেরখীল ও ছনুয়া এলাকার কয়েকটি ভাঙা অংশ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকছে। এর মধ্যে রোসাঙ্গী পাড়া এলাকার বেড়িবাঁধটি চরম বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। শুধু ভাঙনই নয়, বাঁধের যে সামান্য অংশ এখনও টিকে আছে, সেখানেও বড় বড় ফাটল ধরেছে এবং তা ক্রমশ নিচের দিকে দেবে যাচ্ছে, যা আরও বড় ধরনের দুর্যোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্থানীয়দের স্পষ্ট অভিযোগ, অপরিকল্পিত নকশা এবং নির্মাণকাজে চরম নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণেই বাঁধের এই করুণ দশা হয়েছে। সাড়ে ৯ বছর আগে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সাঙ্গু নদী ও বঙ্গোপসাগরের পাড়ে ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রথমে ২৫১ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়, যা পরে বেড়ে ২৯৩ কোটি ৬০ লাখ টাকায় দাঁড়ায়।
প্রকল্প চলাকালীন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কর্তৃক ব্লকের মান পরীক্ষা করা হলে মোট ১১ হাজার ৩৬টি ব্লকের মধ্যে ৩ হাজার ৭৮৭টি ব্লকই অত্যন্ত নিম্নমানের বলে প্রমাণিত হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, সেই ত্রুটিপূর্ণ ও নিম্নমানের ব্লক ব্যবহারের কারণেই বাঁধটি টেকসই হয়নি এবং কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের সাথে মিলে সরকারি টাকা লুটপাট করেছেন।
উপকূলবাসীকে সুরক্ষা দিতে বর্তমানে ‘দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও আনোয়ারায় টেকসই পানি ব্যবস্থা প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’ এর অধীনে আরও ৮৭৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৪৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬ দশমিক ২১০ কিলোমিটার সমুদ্র তীর প্রতিরক্ষা ও বাঁধ সংস্কারের কাজ চলছে। তবে চলমান এই নতুন কাজেও সাধনপুরের বৈলগাঁও এলাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিম্নমানের পাথর ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
প্রকৌশলীদের মতে, ব্লকের পেছনে নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করলে জোয়ারের চাপে পুরো বাঁধ ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
কদমরসুল এলাকার বাসিন্দা শাহেদুল আলম বলেন, ‘প্রতি বছরই বর্ষাকাল ও ঘূর্ণিঝড়ে আমাদের এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলত সংস্কারের নামে নিম্ন মানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, ঠিকাদার ও পাউবোর কর্মকর্তারা বাঁধের টাকা লুটপাট করেছেন। নামের স্থায়ী বেড়িবাঁধ স্থায়ী হলো কোথায়?’
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (বাঁশখালী) অনুপম পাল অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জোয়ারের চাপের কারণেই বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ চলছে এবং চলমান কাজের গুণগত মান কঠোরভাবে বজায় রাখা হচ্ছে। কোনো অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না।
সম্প্রতি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। তিনি কাজের মান ঠিক রাখার জন্য ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের কড়া নির্দেশ দিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে টেকসই সংস্কার কাজ শেষ করার তাগিদ দেন।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বাঁশখালীতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ৩৫ বছর পরও সেই বিভীষিকা মনে করে বর্তমান নাজুক বাঁধের কারণে নিজেদের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন উপকূলবাসী।
সময়ের আলো/জেডি