দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা, দুর্বল সুশাসন এবং ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির সংকটে জর্জরিত বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। এ পরিস্থিতির উন্নয়নে লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১৭ দফা অগ্রাধিকার কর্মসূচির অংশ হিসেবে নেওয়া এই পরিকল্পনাকে বাজার-সংশ্লিষ্টরা পুঁজিবাজার সংস্কারের একটি কার্যকর ও সম্ভাবনাময় নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।
কেন সরকারি কোম্পানির তালিকাভুক্তি অপরিহার্য : বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো উচ্চমানের এবং বড় মূলধনের কোম্পানির অভাব। বর্তমানে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল, যা দেশি ও বিদেশি বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার ও টেলিযোগাযোগ খাতের মতো লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারে এলে বাজারের মানগত পরিবর্তন ঘটবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদের মতে, এটি কেবল নতুন শেয়ারের জোগান দেবে না, বরং পুরো বাজারের গ্রহণযোগ্যতা ও স্থিতিশীলতা বাড়াবে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও বাজারের গভীরতা : গত এক যুগে বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারি ও মূল্য কারসাজির ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। লাভজনক সরকারি কোম্পানিগুলো বাজারে এলে বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎস তৈরি হবে। এর ফলে বাজারে নতুন খাতের সমাহার ঘটবে, সূচকের ওপর নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির আধিপত্য কমবে এবং প্রতিদিনের লেনদেনের গভীরতা বৃদ্ধি পাবে।
সরকারের জন্য বহুমুখী সুবিধা : সরকারি শেয়ার অফলোড করার অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্র মালিকানা হারাবে; বরং সরকার নিয়ন্ত্রক হিসেবে থেকে জনগণের অংশীদারিত্ব বাড়াতে পারবে। এর মাধ্যমে—
রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক বাজারমূল্য নির্ধারণ সম্ভব হবে।
বাজেট বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় তহবিলের নতুন উৎস তৈরি হবে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর স্বাধীন নিরীক্ষা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে, যা করপোরেট সুশাসনকে শক্তিশালী করবে।
বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের বাজারের আকর্ষণ বৃদ্ধি পাবে।
সফল বাস্তবায়নের শর্তাবলি : বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, শুধু তালিকাভুক্ত করাই সফলতার নিশ্চয়তা নয়। এই উদ্যোগকে সার্থক করতে হলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি-
সঠিক মূল্যায়ন : প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের প্রকৃত ও ন্যায্য বাজারমূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
প্রভাবমুক্ত পরিচালনা : রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে করপোরেট সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
কঠোর নজরদারি : বাজার কারসাজি, অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহার রোধে প্রযুক্তিনির্ভর (যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ব্লকচেইন) কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
আইনি সুরক্ষা : ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা : বর্তমানে পুঁজিবাজারে সরকারি মালিকানাধীন প্রায় ২২টি কোম্পানি থাকলেও অনেকগুলোর কার্যক্রম সীমিত। তবে তিতাস গ্যাস, পদ্মা অয়েল, যমুনা অয়েল বা বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের মতো মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিগুলো ইতিবাচক নজির সৃষ্টি করেছে।
নতুন করে আরও লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বাজারে আনার পাশাপাশি বাজার সংস্কার কমিশন গঠন, কর-সুবিধা প্রদান এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে একটি আধুনিক ও টেকসই অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে।
পরিশেষে, স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের এই তালিকাভুক্তি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অন্যথায়, এটি কেবল একটি ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি থেকে যাবে।
সময়ের আলো/আআ