দেশের ব্যাংকিং খাতে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্বল আর্থিক চিত্রের মধ্যে এবার আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির বিপুল আর্থিক বিপর্যয়ের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাহ্যিকভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠান দেখালেও আড়াল করা হয়েছে এক বিশাল আর্থিক ঘাটতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ নীতিগত ছাড় (ডেফারেল) সুবিধা নিয়ে ব্যাংকটি কাগজে-কলমে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা দেখিয়েছে ৮৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
তবে প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষক কে এম আলম অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের মতে, যদি প্রচলিত ব্যাংকিং আইন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে ব্যাংকটি শতভাগ প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করত, তবে মুনাফা তো দূরের কথা, নিট লোকসান গিয়ে দাঁড়াত ৫ হাজার ৩০৭ কোটি টাকায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন ছাড় ও ব্যাংকগুলোর ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে কৃত্রিম মুনাফা দেখানোর এ প্রবণতা একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, ব্যাংকের আমানতকারী এবং সামগ্রিকভাবে দেশের আর্থিক খাতের জন্য এক ভয়াবহ পদ্ধতিগত ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের মোট প্রয়োজনীয় প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৯৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ব্যাংকিং নিয়ম অনুসারে, ব্যাংকের যেকোনো বিনিয়োগ (বিতরণকৃত ঋণ) যখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে, তখন সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দিতে অর্জিত পরিচালন মুনাফা থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ নিরাপত্তা সঞ্চিতি হিসেবে আলাদা করে রাখতে হয়। প্রভিশন যত বেশি রাখতে হয়, ব্যাংকের নিট মুনাফা তত কমে যায়।
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বহিরাগত নিরীক্ষকদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক চিঠি দিয়ে এই ৫ হাজার ৩৯৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার বিশাল ঘাটতিকে ব্যাংকের লাভ-ক্ষতির হিসাবে না দেখিয়ে স্থগিত রাখার অনুমোদন দেয়। এই বিশেষ আইনি ছাড়ের কারণেই ব্যাংকটি নিজেদের দেউলিয়াত্ব আড়াল করে মাত্র ৮৬ কোটি ৫১ লাখ টাকার নিট মুনাফা দেখাতে সক্ষম হয়। যদি এই বিপুল পরিমাণ প্রভিশন ঘাটতিকে স্থগিত না করে নিয়মিত নিয়মে লোকসান হিসেবে হিসাবভুক্ত করা হতো, তবে ব্যাংকটির নিট লোকসান হতো ৫ হাজার ৩০৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা ব্যাংকের সমস্ত সঞ্চিতি ও মূলধনকে গ্রাস করে ফেলত।
গ্রাহক অনাদায়ী থাকলেও দেখানো হয়েছে আদায় : ব্যাংকটি শুধু প্রভিশন আড়াল করে কৃত্রিম মুনাফা দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্টিং গাইডলাইনও অমান্য করেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংকটি প্রকৃতভাবে গ্রাহক থেকে কোনো অর্থ আদায় না করেই সম্পূর্ণ অননুমোদিতভাবে ‘প্রফিট রেন্ট সাসপেন্স অ্যাকাউন্ট’ থেকে ২০ কোটি টাকা ব্যাংকের নিয়মিত মুনাফা হিসেবে খাতায় দেখিয়েছে। ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী, স্থগিত হিসাব বা সাসপেন্স অ্যাকাউন্টের টাকা যতক্ষণ না বাস্তবে নগদ আদায় হয়, ততক্ষণ তা আয় হিসেবে দেখানোর কোনো সুযোগ নেই।
আবার ২০২৫ সালের আয়ের বিপরীতে ব্যাংকের যে পরিমাণ ট্যাক্স প্রভিশন রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল, তার চেয়ে ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা কম দেখিয়েছে। এই অননুমোদিত মুনাফা স্বীকৃতি এবং আয়কর প্রভিশনের ঘাটতি ব্যাংকের কর-পরবর্তী নিট মুনাফা প্রকৃত হিসাবের চেয়ে ৪১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বেশি (ওভারস্টেটেড) দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, ব্যাংক কাগজে যে ৮৬ কোটি ৫১ লাখ টাকার লাভের কথা বলছে, তার মধ্যে ৪১ কোটি ৪০ লাখ টাকাই নিয়মবহির্ভূত।
এই কৃত্রিম মুনাফা প্রদর্শনের বাইরেও ব্যাংকটির মূল ব্যবসায়িক ও ঋণের গুণগত মান চরমভাবে ভেঙে পড়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল জুড়ে হিসাব খাতা পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ৫২৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে। সাধারণত অবলোপন করলে ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের অঙ্ক কমে যাওয়ার কথা।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিপুল অঙ্কের ঋণ অবলোপনের পরও মাত্র এক বছরে ব্যাংকের শ্রেণিকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ ১ হাজার ৯৭১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ব্যাংকের মোট অনাদায়ী বিনিয়োগের অনুপাত (এনপিআই রেশিও) দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা ব্যাংকটিকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। পর্যাপ্ত মুনাফা না থাকায় সমাপ্ত বছরে ব্যাংকটি খেলাপি বিনিয়োগের বিপরীতে কোনো নতুন প্রভিশন রাখতে পারেনি। এ ছাড়া আর্থিক সংকটে বিনিয়োগকারীদের জন্যও কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি।
ব্যাংকটির বিভিন্ন খাতে প্রভিশন ঘাটতির বিশদ বিশ্লেষণ করলে এই ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়। বিনিয়োগ এবং অফ-ব্যালেন্স শিট আইটেমের বিপরীতে যেখানে ৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা প্রভিশন রাখার কথা ছিল, সেখানে ব্যাংক রেখেছে মাত্র ১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যার ফলে এই এক খাতেই ঘাটতি ৪ হাজার ৯৯৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া ব্যাংকের অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল ১৫৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা, কিন্তু ব্যাংক দেখিয়েছে মাত্র ৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যার ফলে এখানেও প্রায় ৯৯ কোটি ২ লাখ টাকার ঘাটতি রয়েছে।
অ-ব্যাংকিং সম্পদের বিপরীতে ৩ কোটি ১ লাখ টাকা প্রভিশন রাখার নিয়ম থাকলেও ব্যাংক কোনো প্রভিশনই রাখেনি। দেশের অন্য যে সব ব্যাংক বর্তমানে তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছে, সেসব ব্যাংকে আল-আরাফাহ ব্যাংকের জমা রাখা ২০৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা প্লেসমেন্ট ফান্ডের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখার কথা থাকলেও ব্যাংক এখানেও কোনো নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখেনি। এমনকি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্র্যাচুইটির জন্য প্রয়োজনীয় ৪২৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকার বিপরীতে গ্র্যাচুইটি অ্যাসেট ফান্ডে আছে মাত্র ৩৪২ কোটি টাকা, যা কর্মীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
এই বিশাল প্রভিশন ঘাটতির সরাসরি ও সবচেয়ে মারাত্মক আঘাত এসেছে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাতের (সিআরএআর) ওপর। কাগজে-কলমে ব্যাংকটি তাদের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত দেখিয়েছে ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ, যার মধ্যে কোর মূলধন বা টায়ার-ওয়ান হলো ৭ দশমিক ১২ শতাংশ এবং সম্পূরক মূলধন বা টায়ার-টু হলো ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। ব্যাসেল-থ্রি’র আন্তর্জাতিক গাইডলাইন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী একটি ব্যাংকের ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ মূলধন অনুপাত থাকা বাধ্যতামূলক। সেই হিসেবে ব্যাংকটি এমনিতেই ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ বা ৬৮৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকার মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক তথ্য হলো, যদি ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সুবিধা না নিয়ে এই ৫ হাজার ৩৯৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতিকে মূলধনের সঙ্গে সমন্বয় করত, তবে ব্যাংকটির সিআরএআর সম্পূর্ণ ঋণাত্মক বা মাইনাসে চলে যেত। মূলধন নেগেটিভ হয়ে যাওয়া মানে ব্যাংকের নিজস্ব কোনো পুঁজি অবশিষ্ট নেই এবং এটি পুরোপুরি আমানতকারীদের জমানো টাকার ওপর ভর করে টেকনিক্যালি এক দেউলিয়া কাঠামোতে রয়েছে।
অন্যদিকে আল-আরাফাহ ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি ‘আইবি ক্যাপিটাল মার্কেট সার্ভিসেস লিমিটেড’-এর আর্থিক অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, সাবসিডিয়ারি কোম্পানির শেয়ার বাজারে করা বিনিয়োগের বাজারদর ১৪২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ধসে পড়েছে। এই বিশাল ধসের বিপরীতে যেখানে সমপরিমাণ প্রভিশন রাখার কথা, সেখানে তারা রেখেছে মাত্র ৫০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
ফলে সাবসিডিয়ারিতে প্রভিশন ঘাটতি ৯২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। যেহেতু আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এই প্রতিষ্ঠানের ৬০ দশমিক ৫০ শতাংশ শেয়ারের একক মালিক, তাই এই লোকসানের মধ্যে ব্যাংকের প্রত্যক্ষ দায় হলো ৫৫ কোটি ৯৪ কোটি টাকা। এখানেও ব্যাংকটি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিশেষ ছাড়ে এই ঘাটতি ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখার অনুমতি পেয়েছে, ফলে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানটির লোকসানও কাগজে দেখায়নি।
প্রতিবেদনে ব্যাংকটির করপোরেট সুশাসন ও আইনি লঙ্ঘন নিয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিয়ের ২০১৯ সালের স্পষ্ট আইনি নির্দেশনা অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যেকোনো কোম্পানির স্বতন্ত্র পরিচালক ব্যতীত বাকি সব উদ্যোক্তা এবং পরিচালকদের যৌথভাবে কোম্পানির মোট পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করা বাধ্যতামূলক। পরিচালকদের নিজস্ব দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য এই আইন করা হলেও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিত শেয়ার ধারণের পরিমাণ মাত্র ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ, যা আইনি সীমার অর্ধেকেরও কম। এটি ব্যাংকের করপোরেট সুশাসনের চরম অবহেলা এবং আইন অমান্যের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা সাময়িকভাবে বিশেষ ছাড় দিয়ে ব্যাংকটিকে কাগজ-কলমে লাভজনক দেখালেও, বাস্তবে এই বিশাল ঘাটতি ব্যাংকিং খাতের জন্য চরম উদ্বেগজনক। কৃত্রিম মুনাফা দেখিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করা এবং আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করা দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ আমানতকারীদের জমানো টাকার নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি অতি দ্রুত নগদ অর্থ আদায় জোরদার করা না হয় এবং খেলাপি ঋণের লাগাম টানা না যায়, তবে এই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো কৃত্রিম মুনাফার বুদ্বুদ যেকোনো সময় ফেটে গিয়ে পুরো দেশের আর্থিক খাতের ওপর এক বড় ধরণের পদ্ধতিগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ব্যাংকটির ডেফারেল নেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির নেপথ্যে এবং জুলাই অভ্যুত্থানের পরও আর্থিক প্রতিবেদনে কারসাজির প্রবণতা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চাওয়া হয়।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাফাত উল্লা খান এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে আরেকটি দায়িত্বশীল সূত্র ব্যাংকটিকে ‘আইসিইউ’তে থাকা রোগীর সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ব্যাংক খাতের এই সংকট শুধু আল-আরাফাহ ব্যাংকেই নয়, পুরো ব্যাংক খাতেরই পরিস্থিতি এমন।
তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে স্রেফ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বোর্ড ভেঙে দেওয়া ব্যাংকটির বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিটে বড় ধরণের লুটপাটের প্রমাণ না পেলেও ‘ইমেজ সংকট’ তৈরি হওয়ায় গ্রাহকদের মাঝে অবিশ্বাস জন্মেছে।
সময়ের আলো/আআ