জলমগ্ন জনপদে বাঁচার লড়াই

জাতীয়

চারদিকে শুধু পানি। যে উঠানে শিশুদের খেলার কথা, সেখানে এখন নৌকা চলছে। ঘরের খাট, রান্নাঘর, ধানের গোলা, মাছের ঘের- সবই

2026-07-11T00:50:38+00:00
2026-07-11T00:50:38+00:00
 
  শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬,
২৭ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
জলমগ্ন জনপদে বাঁচার লড়াই
প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ১২:৫০ এএম 
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার কাথারিয়া এলাকায় বন্যার পানিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ঘরবাড়ি। গতকাল তোলা। ছবি : সময়ের আলো
চারদিকে শুধু পানি। যে উঠানে শিশুদের খেলার কথা, সেখানে এখন নৌকা চলছে। ঘরের খাট, রান্নাঘর, ধানের গোলা, মাছের ঘের- সবই তলিয়ে গেছে। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন পাশের দোতলা ভবনে, কেউ ঘরের মাচায়, আবার কেউ সন্তানকে কোলে নিয়ে অপেক্ষা করছেন ত্রাণ কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের। 

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন, ভেসে গেছে ঘরবাড়ি ও জীবিকা। এর মধ্যেই বাঁশখালী ও কক্সবাজারে পানিতে ডুবে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কোথাও পানি কমার লক্ষণ নেই, কোথাও আবার পানি নামলেও শেষ হয়নি মানুষের দুর্ভোগ।

বাঁশখালীর ৯০ শতাংশ বাড়িঘর পানির নিচে, দুই শিশুর মৃত্যু : বাঁশখালীর পাকা দালান ছাড়া ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ বাড়িঘর এখন পানির নিচে। কোথাও গলাসমান, কোথাও কোমরসমান পানি। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের ২১২টি গ্রামের অধিকাংশই এখন পানির তলায়। বাঁশখালী-চট্টগ্রাম মূল সড়কের একাংশ ভেঙে গেছে। পুকুর ও মাছের খামার ভেসে গেছে পানিতে। হাঁস-মুরগিও হারিয়েছেন অনেকে। অসুস্থ মানুষ আর গর্ভবতী নারীদের নিয়ে সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছেন পরিবারগুলো। এর মধ্যেই বঙ্গোপসাগরের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে উপকূলজুড়ে।
শেখেরখীল হিন্দুপাড়ার বাসিন্দা প্রান্ত দেব বলেন, পাকা দালানের বাসিন্দারা কিছুটা নিরাপদ থাকলেও কাঁচা, টিনশেড ও মাটির ঘরগুলো পুরোপুরি ভাসছে পানিতে। পানি কমছে না। উল্টো বাড়ছে।’

ছনুয়া ইউনিয়নের খুদুকখালী গ্রামের বাসিন্দা জুনাইদুল ইসলাম জানান, ‘পশ্চিম বাঁশখালীর পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম জলকদর খাল। খাল দখল হয়ে ভরাট হয়ে গেছে। সøুইসগেটগুলোও অকার্যকর। বিভিন্ন জায়গায় মাছের ঘেরের জন্য দেওয়া বাঁধের কারণে পানি নামার পথও রুদ্ধ। এর ফলে পুরো এলাকা তলিয়ে আছে। বন্ধ হয়ে গেছে সড়কে যান চলাচল। ছনুয়ার তিন দিকে জলকদর ও পশ্চিম দিকে বঙ্গোপসাগর। এই ইউনিয়ন থেকে সহজে পানি নিষ্কাশন হওয়ার কথা। কিন্তু চিংড়ি ঘেরের নামে প্রভাবশালীরা স্লুইসগেট আটকে রাখায় এই অবস্থা হয়েছে।

এদিকে উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নে ছড়ার পানিতে ডুবে মো. আশিক (১১) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে বাহারছড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ ইলশা এলাকার মফজল আহমদের নতুন বাড়ির সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া সরল ইউনিয়নে পানিতে তলিয়ে গিয়ে ৫ বছর বয়সি আরেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সাতকানিয়ায় অসহায় মানুষ : চারদিকে শুধু পানি। যত দূর চোখ যায়, বাড়িঘর, উঠান, রাস্তা, পুকুর সব একাকার। কোথাও টিনের চাল দেখা যাচ্ছে, কোথাও শুধু গাছের মাথা। মাঝেমধ্যে একটি নৌকা নীরবে ভেসে যাচ্ছে। বন্যার তৃতীয় দিনেও এমন দৃশ্য চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের তেমুহনি গ্রামে। গ্রামের প্রবেশমুখে দাঁড়ালেই মনে হয়, জনপদটি যেন নদীর বুকে ভাসছে। কোথাও আর উঠান নেই, নেই গ্রামের চিরচেনা মেঠোপথ। টিনের ঘরের চূড়া, সুপারি ও নারকেল গাছের মাথা আর বিদ্যুতের খুঁটি ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না।

বন্যার টানা তিন দিন পরও গ্রামের অধিকাংশ এক তলা বসতঘরে গলাসমান পানি। কোথাও কোথাও পানির উচ্চতা আরও বেশি। ঘরের দরজা-জানালা, খাট, আলমারি, রান্নাঘর সবই পানির নিচে। অনেকেই শেষ মুহূর্তে কিছু কাপড়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর শিশুদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন পাশের দোতলা বাড়িতে। যাদের যাওয়ার জায়গা নেই, তারা ঘরের মাচা কিংবা উঁচু স্থানে কোনোমতে টিকে আছেন।

শুক্রবার সরেজমিন দেখা যায়, গ্রামের একটি দোতলা ভবনের ওপর আশ্রয় নিয়েছে অন্তত চারটি পরিবার। একটি কক্ষে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন প্রায় ৩০ জন। শিশুদের কান্না, বৃদ্ধদের অসহায় মুখ আর মায়েদের উৎকণ্ঠা যেন পুরো পরিবেশকে ভারী করে তুলেছে।

আশ্রয় নেওয়া গৃহবধূ আছিয়া খাতুন বলেন, আমাদের ঘরে কোমরেরও ওপরে পানি। নিচে কিছুই নেই। চাল-ডাল, কাপড়, বিছানা সব পানিতে নষ্ট হয়েছে। তিন দিন ধরে ঠিকমতো রান্না হয়নি। বাচ্চারা শুধু খাবার চায়, কিন্তু দেওয়ার মতো কিছু নেই। ৬০ বছর বয়সি আব্দুল জলিল কাঁপা কণ্ঠে বলেন, এত বয়সে অনেক বন্যা দেখেছি, কিন্তু এমন অসহায় অবস্থা দেখিনি। পানি বাড়তেই আছে। আমরা শুধু অপেক্ষা করছি, কেউ যদি একটু খাবার আর বিশুদ্ধ পানি নিয়ে আসে।

কক্সবাজারে পরিস্থিতির অবনতি ও শিশুর মৃত্যু : টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। ভারীবর্ষণে তলিয়ে গেছে সড়ক, উপ-সড়ক, বাড়িঘর ও ফসলি মাঠ। পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে জেলার ১০ উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নের ৫ লাখের বেশি মানুষ। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। ৬৪০টি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ১৪ হাজার ৬১ জন। সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার নগদ টাকা।

এদিকে শুক্রবার ভোর থেকে বিভিন্ন এলাকায় আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। উপজেলার শতাধিক গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যেই নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে মৃত্যু হয়েছে এক শিশুর। আরও দুই শিশুকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত শিশুর নাম হাসনাতু জান্নাত (১২)। সে উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ গ্রামের আবদুল মালেকের মেয়ে। হাসপাতালে ভর্তি দুই শিশু হলো হাসনাতু জান্নাতের বোন জেরিন মনি (৮) আর শাওরিন মনি (৬)। স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।

খাগড়াছড়িতে এখনও ডুবে আছে সড়ক : বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এখনও যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। দীঘিনালা-সাজেক সড়কের কবাখালী এলাকার পানি সরে যাওয়ায় শুক্রবার থেকে বাঘাইহাট-মাচালং-সাজেক সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। সাজেক থেকে ফিরেছেন আটকে পড়া পর্যটকরা।

তবে দীঘিনালা-লংগদু ও খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কে টানা তৃতীয় দিনের মতো যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া মহালছড়ি উপজেলায় একটি সেতু তলিয়ে যাওয়ায় মুবাছড়ি এলাকার সঙ্গে উপজেলা সদরের সরাসরি যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিল পারভেজ বলেন, বৃহস্পতিবার রাত থেকে পানি কমতে শুরু করায় কবাখালী সড়ক থেকে পানি নেমে গেছে। উপজেলার মাইনী নদীর পানিও কমছে। তবে নিম্নাঞ্চল হওয়ায় মেরুং ইউনিয়নের ২০ গ্রাম প্লাবিত রয়েছে। ইউএনও বলেন, উপজেলায় ২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে সাত হাজারের বেশি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তাদের জন্য খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

রাঙামাটিতে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত : টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় অন্তত ৩৭০টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য জেলার ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৫২৪ জন মানুষ অবস্থান করছেন। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঘাইছড়ি উপজেলা। এ ছাড়া জুরাছড়ি উপজেলার মৈদং, জুরাছড়ি সদর ও বনযোগীছড়া ইউনিয়ন, বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকা এবং বরকল উপজেলার নিম্নাঞ্চলেও বন্যার পানি প্রবেশ করেছে।

এদিকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে শুক্রবার পাঁচটি ইউনিট চালু রেখে ১৭৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। কেন্দ্রটির পাঁচটি ইউনিটের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২৪০ মেগাওয়াট।

সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় সাজেক থেকে ফিরলেন ৪২১ পর্যটক : টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে সাজেকে আটকে পড়া ৪২১ পর্যটককে সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিরাপত্তা স্কটের মাধ্যমে নিরাপদে খাগড়াছড়ির পথে পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে সাজেক পর্যটন এলাকা থেকে পর্যটক বহনকারী ১০১টি ছোট-বড় যানবাহন সেনাবাহিনী ও ট্যুরিস্ট পুলিশের নিরাপত্তায় বাঘাইহাট হয়ে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়।

খাগড়াছড়িসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে দীঘিনালা-সাজেক-বাঘাইহাট সড়কের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছিল। তবে পানি কিছুটা কমে আসা এবং আবহাওয়ার উন্নতি হওয়ায় আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বান্দরবানে পানি নামতে শুরু করলেও ভোগান্তির শেষ নেই : টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় কয়েক হাজার মানুষ চারদিন ধরে পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ নিম্নাঞ্চলের সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। 

শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমে আসায় বন্যার পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। তবে আবার ভারী বৃষ্টি হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। পানিবন্দি অনেক পরিবার স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছেন।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান সদরে ৪৬টি, রুমায় ২৮টি, রোয়াংছড়িতে ১৯টি, থানচিতে ১৫টি, আলীকদমে ১৫টি, লামায় ৫৫টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৪২টিসহ মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বুধবার রাত ৮টা পর্যন্ত বান্দরবান সদরের ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৫ হাজার বন্যাকবলিত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। আবহাওয়া অধিদফতরের বান্দরবান কার্যালয়ের অফিসার ইনচার্জ সনাতন কুমার মণ্ডল জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় শনিবার বেলা ৩টা পর্যন্ত জেলায় ১১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, বৃষ্টিপাত কমে পানি কিছুটা নামলেও বান্দরবান পৌর এলাকার হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, ক্যংচিংঘাটা, বালাঘাটা, বরিলাশপাড়া, মারমা বাজার নদীপাড়, কাশেমপাড়া, মেম্বারপাড়া, লেমুঝিরি, রেইচা ও গোয়ালিয়াখোলাসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে এখনও কোমর থেকে গলাসমান পানি রয়েছে। 

এতে হাজারো মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। জেলা শহরের বালাঘাটা এলাকায় এখনও সড়কে কোমরসমান পানি রয়েছে। অন্যদিকে রেইচা, গোয়ালিয়াখোলা ও থুংখি পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় নৌকাই মানুষের একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে পারাপারের ভাড়া ছিল ২০ টাকা, সেখানে জরুরি প্রয়োজনে অনেককে ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে।

খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি ৩০ হাজার মানুষ : টানা বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার সদর উপজেলার অন্তত ২৫টি গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি বানিয়াচং উপজেলার মক্রমপুর ইউনিয়নের আরও পাঁচটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ ও নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে বানিয়াচং উপজেলার মক্রমপুর ইউনিয়নের রাধাপুর এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। একই দিন রাত প্রায় ৯টার দিকে সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ বাজার এলাকায় নদীর আরেকটি বাঁধ ভেঙে যায়। এরপর দ্রুত আশপাশের এলাকায় বন্যার পানি ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার সকাল থেকে সদর উপজেলার পইল ইউনিয়নের কয়েকটি নতুন গ্রামও বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। 

বন্যাকবলিত এলাকার মধ্যে সদর উপজেলার মশাজান, সুলতানশী, যমুনাবাদ, আব্দাখাই, লস্করপুর, হাতিরথান, বনগাঁও, বনদক্ষিণ, পইল ইউনিয়নসহ অন্তত ৩০টি গ্রাম রয়েছে। অন্যদিকে বানিয়াচং উপজেলার মক্রমপুর ইউনিয়নের রাধাপুর, কাবিলপুরসহ পাঁচটি এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। আকস্মিক বন্যায় অধিকাংশ গ্রামের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অনেক বাড়িঘরে কোমর থেকে বুকসমান পানি উঠেছে, ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

মৌলভীবাজারে অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত : মৌলভীবাজার জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। জেলার কুশিয়ারা, মনু, ধলাই ও জুড়ী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে মনু নদীর রাজনগরের দুটি এবং কুলাউড়ার একটি পয়েন্টে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। 

এদিকে হাকালুকি হাওড়, কাউয়াদীঘি হাওড় এবং হাইল হাওড়ে ব্যাপক হারে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, রাজনগর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। হাইল হাওড়ের পানি আংশিকভাবে হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে জেলার বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুক্রবার পর্যন্ত জেলার প্রধান নদ-নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

হাতিয়ায় পানিবন্দি ৫০ হাজার মানুষ : নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের প্রায় ৮০টি গ্রাম এখনও জলাবদ্ধতায় ডুবে রয়েছে। কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও অন্তত ৫০ হাজার মানুষ এখনও পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। রান্নার চুলা তলিয়ে যাওয়ায় বহু পরিবার ঠিকমতো খাবার রান্না করতে পারছে না। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। 

অন্যদিকে আমনের বীজতলা, সবজিক্ষেত ও মাছের ঘের তলিয়ে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক ও মৎস্যচাষিরা। উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, সোনাদিয়া, বুডিরচর, হরনী, চানন্দী, চরকিং, সুখচর, নলচিরা, জাহাজমারা, তমরদ্দি ও চর ঈশ্বর ইউনিয়নসহ হাতিয়া পৌরসভার অধিকাংশ ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও বাড়িঘরের আঙিনা, কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবার কোথাও কাঁচা-পাকা সড়ক ও হাট-বাজার পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় ঘরের ভেতরেও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে।



  বিষয়:   জলমগ্ন  জনপদ  বাঁচার লড়াই 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: