প্রযুক্তিতে পুলিশকে টপকে যাচ্ছে অপরাধীরা

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেলেও অপরাধ দমনে তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরাধীরা

2026-07-11T01:02:57+00:00
2026-07-11T01:02:57+00:00
 
  শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬,
২৭ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
প্রযুক্তিতে পুলিশকে টপকে যাচ্ছে অপরাধীরা
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ১:০২ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেলেও অপরাধ দমনে তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরাধীরা এখন ভিপিএন, টর ব্রাউজার, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, ভার্চুয়াল নম্বর, ফেক এনআইডি দিয়ে সিম, ক্রিপ্টো পেমেন্ট, এআই জেনারেটেড ভয়েস-ভিডিও, ডিপফেক, ফিশিং কিট, রিমোট অ্যাকসেস টুল এবং ডার্কওয়েব মার্কেটপ্লেস ব্যবহার করছে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে পুলিশকেও গোলকধাঁধায় ফেলে দিচ্ছে। 

তবে সীমিত জনবল ও সক্ষমতা নিয়ে পুলিশ প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে কাজ করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আরও আধুনিকায়নের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশসংশ্লিষ্টরা। অপরাধীরা এখন শুধু অস্ত্র নয়, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। একসময় পুলিশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল চুরি, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড। এখন অপরাধের বড় অংশ ঘটছে অনলাইন দুনিয়াতে। 

কয়েক মিনিটের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র। বিদেশে বসে পরিচালিত হচ্ছে অনলাইন জুয়া, হুন্ডি, মানব পাচার এবং সাইবার জালিয়াতি। পুলিশ সদর দফতর থেকে গত ৭ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এটিইউর নাম পরিবর্তনসংক্রান্ত প্রস্তাবনায় পুলিশে নিরাপত্তাব্যবস্থার আধুনিকায়নের গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়, দেশে-বিদেশে নিরাপত্তা হুমকির ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে প্রচলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা জরুরি।

আধুনিকায়ন হয়েছে যেসব সেবা : প্রযুক্তি পরিবর্তনের দিকে লক্ষ রেখে পুলিশের সব উইং এখন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ দিচ্ছে।

অনলাইন জিডি, ডিজিটাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, সিসি ক্যামেরা বিশ্লেষণ, সাইবার ক্রাইম তদন্ত, ডিজিটাল ফরেনসিক এবং তথ্যভিত্তিক অপরাধ বিশ্লেষণের মতো উদ্যোগ পুলিশের সেবা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর করেছে। ফলে সেবা পাওয়ার সময় কমেছে। তদন্তের গতি বেড়েছে এবং অপরাধ শনাক্ত করাও সহজ হয়েছে।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে ধাপে ধাপে চালু করা হয়েছে একাধিক ডিজিটাল সেবা। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোলব্যবস্থা, সিসি ক্যামেরা মনিটরিং, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি।

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর পুলিশে বর্তমানে এআইভিত্তিক রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ভায়োলেশন ডিটেকশন সিস্টেম, হোটেল বোর্ডার ইনফরমেশন সিস্টেম, হ্যালো ডিএমপি অ্যাপ, অনলাইন ট্রেনিং সিস্টেম, লিভ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ট্রাফিক ডিউটি ডিস্ট্রিবিউশন সফটওয়্যার, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন সফটওয়্যার এবং ট্রাফিক নিউজ আর্কাইভসহ একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু রয়েছে।


গত ২৯ এপ্রিল আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির এক দিনে ৯টি অ্যাপ ও সফটওয়্যার উদ্বোধন করেন। সেগুলো হলো- এআইবেজড রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ভায়োলেশন ডিটেকশন সিস্টেম, হোটেল বোর্ডার ইনফরমেশন সিস্টেম, হ্যালো ডিএমপি অ্যাপ, ডিএমপি অনলাইন ট্রেনিং সিস্টেম, ডিএমপি রেসিডেন্স অ্যালোকেশন সিস্টেম, ডিএমপি লিভ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ডিএমপি ট্রাফিক ডিউটি ডিস্ট্রিবিউশন সফটওয়্যার, ডিএমপি এমপ্লয়ি পারফরম্যান্স ইভ্যালুয়েশন সফটওয়্যার এবং ডিএমপি ট্রাফিক নিউজ আর্কাইভ।

মোবাইল ফোন ব্যবহার করে কোনো অপরাধ করলে তা কোনো না কোনোভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শনাক্ত করতে পারে। একটি মোবাইল ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইস থেকে মুছে ফেলা হলেও সেই তথ্য তারা বের করতে পারেন। ঘটনাস্থল থেকে হাতের ছাপ বা শারীরবৃত্তীয় আলামত সংগ্রহের উপকরণ ও কৌশল এখন থানা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সিআইডি ও র‌্যাবের পরীক্ষাগারের এসব আলামত বিশ্নেষণ করা যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজে রয়েছে ন্যাশনাল ডিএনএন প্রোফাইলিং ও ফরেনসিক ল্যাবরেটরি।

সন্দেহভাজনদের ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করার এখতিয়ারও সিআইডির রয়েছে। অপরাধী বা অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তে ব্যবহৃত হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডার।

তারপরও আছে অনেক সীমাবদ্ধতা : প্রযুক্তিগত বিভিন্ন উন্নয়ন সংযুক্ত করা হলেও এখনও অনেক ক্ষেত্রেই তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টার। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেফতার হন বাংলাদেশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। এআই ক্যামেরার মাধ্যমে তার ফেস ডিটেকশনের মাধ্যমে সার্ভারে থাকা তথ্যে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জালে ধরা পড়েন তিনি। 

সিসি ক্যামেরা অপরাধী ও সাক্ষ্যপ্রমাণ শনাক্তে সহায়তা করলেও পরিকল্পনাকারীদের সম্পর্কে তথ্য জেনে হাতেনাতে ধরার জন্য দরকার আরও উন্নত প্রযুক্তি, যা এখনও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। আবার জঙ্গিরা প্রায়ই এমন কিছু সুরক্ষিত অ্যাপ ব্যবহার করছে এর ওপর নজরদারির সক্ষমতাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই।

কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, পুলিশের পক্ষে ‘ডার্ক ওয়েব’ থেকে তথ্য নেওয়া সম্ভব হয় না। সাইবার জগতের ওপরের স্তর নিয়ে কাজ করতে পারে পুলিশ। নিচের স্তরগুলো থাকে পুরোপুরি নজরদারির বাইরে। উগ্রপন্থিদের সুরক্ষিত অ্যাপ ব্যবহারের তথ্য-প্রমাণ পেতে পুলিশের কাউন্টার পার্ট হিসেবে উন্নত অনেক দেশের সহযোগিতা চাওয়া হয়।

অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় অনলাইন প্যাট্রলিং জরুরি। ই-প্যাট্রলিংয়ের জন্য উন্নত সফটওয়্যার দরকার। পুলিশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখনও ম্যানুয়ালি অনলাইন প্যাট্রলিং করে থাকে। এ ছাড়া কোনো একটি অপরাধের ঘটনার পর প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তুলে নিয়ে আসার সক্ষমতা এখনও পুলিশের তৈরি হয়নি। এ ছাড়া বহু দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী নিজস্ব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যেকোনো ঘটনার নানা ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে বলে মনে করেন সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল ফরেন বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান রেজা। তবে অপরাধীরা যেভাবে দ্রুত প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, সেই তুলনায় সক্ষমতা এখনও পর্যাপ্ত নয় বলেও মনে করেন তিনি। অপরাধীরা এখন ভিপিএন, টর ব্রাউজার, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, ভার্চুয়াল নম্বর, ফেক এনআইডি দিয়ে সিম, ক্রিপ্টো পেমেন্ট, এআই জেনারেটেড ভয়েস-ভিডিও, ডিপফেক, ফিশিং কিট, রিমোট অ্যাকসেস টুল এবং ডার্কওয়েব মার্কেটপ্লেস ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতাকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঘাটতি প্রসঙ্গে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক ফরেনসিক টুলস, ল্যাব সুবিধা, আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে দ্রুত ডেটা পাওয়ার প্রক্রিয়া এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাদের টেকনিক্যাল ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। আমাদের ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়।

তিনি বলেন, বিদেশে অবস্থান করে সংঘটিত অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশ আংশিক সক্ষম। কিন্তু বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদেশি প্ল্যাটফর্ম থেকে দ্রুত তথ্য পাওয়া। মেটা, গুগল, টেলিগ্রাম, এক্স, ক্লাউড সার্ভিস প্রোভাইডার বা বিদেশি ব্যাংকিং/ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ থেকে তথ্য পেতে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া লাগে। এ কারণে ক্রস বর্ডার এভিডেন্স ইকুইজিশন আরও শক্তিশালী করা জরুরি।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আগামী পাঁচ বছরে এআইবেজড ফ্রড, ডিপফেক ব্ল্যাকমেইল, ফিন্যান্সিয়াল ফিসিং, মোবাইল ব্যাংকিং ফ্রড, র‌্যানসমওয়্যার, ক্রিটিকাল ইনফ্রাসট্রাকচার অ্যাটাক এবং অনলাইন র‍্যাডিক্যালাইজেশন, ডার্ক ওয়েবভিত্তিক ডাটা বা তথ্য কেনাবেচার মতো অপরাধগুলো বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে।

পরিকল্পনায় যা আছে : তবে বাংলাদেশে আগামী প্রজন্মের পুলিশিংব্যবস্থায় কী কী প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটানো যায় সেই চেষ্টা চলছে। তা নিয়ে একটি প্রাথমিক রূপরেখাও তৈরি করা হয়েছে বলে জানা যায়।

যুগোপযোগী পুলিশিংব্যবস্থায় আগামীতে পুলিশের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- স্কুল অব কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ডকট্রিন অব ট্যাকটিস, কেন্দ্রীয় সাইবার সেন্টার, ট্যাকটিক্যাল প্রটেকশন স্কুল, ন্যাশনাল ট্যাকটিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুলিশ ইনোভেশন সেন্টার, স্কুল অব স্পেশাল উইপন অ্যান্ড ট্যাকটিস ও স্কুল অব বম্ব অ্যান্ড ব্যালিস্টিক সায়েন্স।

পুলিশ যা বলছে : অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান সময়ের আলোকে বলেন, অনলাইনভিত্তিক অপরাধীরা খুবই সুসংগঠিত। বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনে যে কেউ অপরাধ করতে পারে। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় আর্ন্তজাতিক মানসম্মত যে ধরনের সক্ষমতা প্রয়োজন তা এখনও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। তবে সীমিত জনবল ও সক্ষমতা নিয়েই সিআইডি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। 

সিআইডির পক্ষ থেকে নিয়মিত সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে করণীয় বিষয়ে অবগত করা হচ্ছে, সরকারের এ বিষয়ে সদিচ্ছাও আছে। বর্তমানে অনলাইন অপরাধ মোকাবিলায় সিআইডি বাংলাদেশ ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসসহ (এমএফএস) সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এ ছাড়া সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। 

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   প্রযুক্তিত  পুলিশ  অপরাধী 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: