দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দীর্ঘ মন্দা ও অস্থিরতা কাটিয়ে অবশেষে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নানামুখী নীতিগত সংস্কার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার যুগোপযোগী পদক্ষেপের ফলে বাজারে গতিশীলতা ফিরে এসেছে।
সদ্য সমাপ্ত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক উর্ধ্বমুখী থাকার পাশাপাশি বাজার মূলধন ও লেনদেনের পরিমাণে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সাধারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুঁজিবাজারে এই ইতিবাচক ধারার সৃষ্টি হয়েছে।
সূচকের সন্তোষজনক উত্থান ও বাজার মূলধনের উল্লম্ফন : সাপ্তাহিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুন মাসের শেষ সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স যেখানে ৫,৭৪৪ পয়েন্টে অবস্থান করছিল, সেখানে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের সমাপ্তিতে তা ৬০ পয়েন্ট বা ১.০৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫,৮০৪ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। সূচকের এই ধারাবাহিক উথান বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওর অবমূল্যায়ন ঠেকাতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
একই সময়ে বাজারে নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ার কারণে ডিএসইর বাজার মূলধনও বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। জুন মাসের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৯২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা, যা চলতি সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মূলধন তথা সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ হাজার ২১৩ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ। বাজার মূলধনের এই বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, বিনিয়োগকারীরা এখন বাজারে দীর্ঘমেয়াদে শেয়ার ধরে রাখার মানসিকতা তৈরি করছেন, যা একটি স্থিতিশীল বাজারের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধি ও লেনদেনে গতি : চলতি সপ্তাহে ডিএসইতে তারল্যের প্রবাহ আগের সপ্তাহের তুলনায় দৃশ্যমানভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত সপ্তাহে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা, যা চলতি সপ্তাহে ২০.৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে অতিরিক্ত ৯৭৮ কোটি টাকার নতুন তারল্য সঞ্চালিত হয়েছে।
দৈনিক গড় লেনদেনের দিকে তাকালে দেখা যায়, আগের সপ্তাহের প্রায় ৯৫২ কোটি টাকার বিপরীতে এই সপ্তাহে দৈনিক গড় লেনদেন ছাড়িয়েছে ১ হাজার ১৪৭ কোটি টাকারও বেশি। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে বিনিয়োগকারীদের ক্রয়ের চাপ এতটাই তীব্র ছিল যে, আগের দিনের ১ হাজার ১৬০ কোটি টাকা থেকে লেনদেন এক লাফেই ২৩.৬ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এক দিনে ১৪০০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হওয়া সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম একটি মাইলফলক, যা বাজারে বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ সক্রিয়তার বহিঃপ্রকাশ।
খাতভিত্তিক লেনদেনের চিত্র : সপ্তাহজুড়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বেশ কয়েকটি খাত। এর মধ্যে বরাবরের মতো প্রথম স্থান ধরে রেখেছে টেক্সটাইল (বস্ত্র) খাত, যা মোট সাপ্তাহিক লেনদেনের প্রায় ১৭.১ শতাংশ নিজেদের দখলে রেখেছে। তবে এই সপ্তাহে চমক দেখিয়েছে সাধারণ বীমা খাত। এই খাতের অধীনে থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর যেমন বেড়েছে, তেমনই মোট লেনদেনে অবদান ছিল ১৫.৮ শতাংশ।
এ ছাড়া ওষুধ ও রসায়ন খাত মোট লেনদেনের ৮.৭ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। খাতের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি দর বৃদ্ধি পেয়েছে পাট এবং কাগজ ও মুদ্রণ খাতে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিমুক্ত এবং ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারের দিকে ঝুঁকছেন বলেই নির্দিষ্ট কিছু খাতে বড় আকারের তারল্য প্রবাহ তৈরি হচ্ছে।
অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি রোধে কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা : ডিএসইর গত সাত দিনের কার্যক্রমে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, পুঁজিবাজারে কোনো ধরনের কারসাজি বা কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি সহ্য করবে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা। গত সপ্তাহে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির দায়ে ‘উসমানিয়া গ্লাস’ এবং ‘মেঘনা পেট’-এর শেয়ার লেনদেন মাঝপথে স্থগিত করা হয়। এর ঠিক আগের কার্যদিবসে একইভাবে ‘জিল বাংলা সুগার মিলস’-এর লেনদেনও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল।
এ ছাড়া ধারাবাহিক লোকসানের কারণে মূলধন হারিয়ে ফেলা কোম্পানিগুলোর বিষয়েও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী লোকসানি কোম্পানি ‘ইনটেক লিমিটেড’-কে মূল বাজার থেকে সরিয়ে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে (জাঙ্ক স্টক) স্থানান্তর করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন ত্বরিত এবং কঠোর পদক্ষেপের ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি বার্তা গেছে যে, তাদের বিনিয়োগ এখন অনেক বেশি সুরক্ষিত। কারসাজিকারীদের দৌরাত্ম্য কমে আসায় বাজারে সুস্থ ধারার লেনদেন শুরু হয়েছে।
আস্থা বৃদ্ধির নেপথ্যে পুঁজিবাজারের এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের পেছনে বেশ কয়েকটি বড় কারণ দেখছেন বাজার বিশ্লেষক ও ব্রোকারেজ হাউস সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রথমত নবনিযুক্ত বিএসইসি চেয়ারম্যানের নানামুখী বিনিয়োগ-বান্ধব সিদ্ধান্ত বাজারকে চাঙ্গা করেছে। ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জটিল নিয়ম কিছুটা শিথিল করে অর্ধবার্ষিক করার প্রতিশ্রুতি এবং মার্জিন ঋণ নীতিমালার বাস্তবমুখী সংস্কারের উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের মাঝে দারুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
দ্বিতীয়ত বাজেটোত্তর সময়ে প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের পুঁজিবাজার নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ বিনিয়োগকারীদের ভীতি দূর করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারে নতুন করে পোর্টফোলিও বাড়াতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে সামনে বেশ কিছু বড় কোম্পানির বোর্ড সভা থাকায় সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগ মহল অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাবাদী অবস্থানে রয়েছে।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, নতুন কমিশনের চেয়ারম্যান অনেক জানেন। তিনি নিয়মগুলো সহজ করছেন, যার ফলে বিনিয়োগকারীরা সামনে আশা দেখছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই কঠোর পদক্ষেপ ও নজরদারির প্রশংসা করে তিনি বলেন, পুরো পৃথিবীতে সবসময় শেয়ার বাজারে সতর্কতা আছে। মার্কেটে আপস অ্যান্ড ডাউন থাকে, তবে জুয়াড়িরা যাতে বাজার নিয়ে খেলতে না পারে সে জন্য ডিএসইর সার্ভাইলেন্স (পর্যবেক্ষণ) ও আইনি ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটা একটা ভালো দিক।
তবে মার্জিন লোনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সংস্কার এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মার্জিন লোন জেড এবং বি ক্যাটাগরিতে বন্ধ। এ ক্যাটাগরিতে তাও সেটা শর্ত সাপেক্ষে। এর ফলে আগের মতো খারাপ কোম্পানি নিয়ে কারসাজি করার সুযোগ আর থাকবে না এবং বাজার ডিস্ট্রিবিউশন আরও ব্রড ও পার্টিসিপেটরি হবে।
এ ছাড়া বাজেটে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজেটোত্তর সময়ে প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের পুঁজিবাজার নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ বিনিয়োগকারীদের ভীতি দূর করেছে।
সরকারের ট্যাক্স বা কর সংক্রান্ত কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, বাজেট পাশের সময় ফাইন্যান্স বিলে শেয়ার বাজারের জন্য অনেকগুলো ট্যাক্স রিলেটেড রিলিফ (কর ছাড়) দেওয়া হয়েছে। যেমন- ব্যক্তি শ্রেণীর জন্য ডিভিডেন্ড ইনকামের (লভ্যাংশ আয়) ওপর চূড়ান্ত কর ১৫% করা এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট কর কমানোর মতো অত্যন্ত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বাজারকে চাঙ্গা করতে বড় ভূমিকা রাখছে।
পুঁজিবাজার সামনে আরও অনেক বড় হবে এমন আশা ব্যক্ত করে অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বাজারে নতুন কোম্পানি আসবে, মাল্টিন্যাশনাল থেকে আসবে, লোকাল ভালো কোম্পানিগুলো থেকে আসবে আর হচ্ছে সরকারি কোম্পানিগুলো থেকে আসবে। এই তিন সোর্স থেকে সাইড বাই সাইড বন্ড মার্কেট আর সুকুক মার্কেট- এগুলোতে উন্নতি হবে।
অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন, ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের এই সমস্যা দূর করতে সরকারের সর্বোচ্চ মহলেরও এখন মূল অগ্রাধিকার পুঁজিবাজারের উন্নয়ন করা। ব্যাংক খাতের সংকটের দিকে ইশারা করে তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এখন ব্যাংকগুলাকে সব বিপদে ফেলেছে। এই যে ব্যাংকের ক্লাসিফাইড লোন, এগুলা তো ৯০% লং টার্ম লোন, যার মেয়াদ ১০ বছর ১২ বছর। উচিত ছিল পুঁজিবাজার থেকে নেওয়া।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিএসইর সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এটা স্পষ্ট যে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আবার সুদৃঢ় অবস্থানে ফিরে আসছে। সূচক ও লেনদেনের এই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলে এবং বিএসইসির সংস্কার কার্যক্রম যদি আরও গতিশীল হয়, তবে আগামী মাসগুলোতে পুঁজিবাজার দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম বড় চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও