বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় রাজধানীর ১০৩ স্পট

সমীরণ রায়

জাতীয়

রাজধানীতে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। শুক্রবার রাজধানীতে

2026-07-11T06:08:30+00:00
2026-07-11T06:08:30+00:00
 
  শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬,
২৭ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধ নগরীতে ভোগান্তি
বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় রাজধানীর ১০৩ স্পট
সমীরণ রায়
প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৬:০৮ এএম 
টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে। রাজধানীর গ্রীন রোড এলাকা থেকে শুক্রবার তোলা। ছবি : শেখ ফেরদৌস
রাজধানীতে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। শুক্রবার রাজধানীতে ভোর রাত থেকেই তীব্র বৃষ্টি শুরু হয়। টানা বর্ষণে নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও নিম্নাঞ্চলে পানি জমেছে। বিশেষ করে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে জনভোগান্তি আরও তীব্র হয়েছে। খেটে খাওয়া মানুষ ও রিকশাচালকদের দুর্ভোগ বেড়েছে বহুগুণে। 

গতকাল সাপ্তাহিক ছুটি হওয়ার কারণে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত বন্ধ থাকায় বিভিন্ন সড়কে মানুষের উপস্থিতি অনেকটাই কম ছিল। তবে ছুটির দিন হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েন কর্মজীবী মানুষরা। বেশিরভাগ কর্মজীবীই ছুটির দিন সাপ্তাহিক বাজার করেন। তারা বাজার করতে গিয়ে পড়েন বিপাকে। এ ছাড়া ভোর রাত থেকে টানা বৃষ্টি হওয়ার কারণে জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষ, রিকশাচালক, পথচারী এবং শ্রমজীবী মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

রাজধানী ঘুরে দেখা গেছে শাহবাগ, মালিবাগ, মৌচাক, বিজয়নগর, নিউমার্কেট, আজিমপুর, ধানমন্ডি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, পল্টন, আরামবাগ, মুগদা-মান্ডা, খিলগাঁও, রামপুরা,  পুরান ঢাকা, মতিঝিল, কাকরাইল, শান্তিনগর ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কে টানা বৃষ্টিতে সড়ক ও অলিগলি জলমগ্ন হয়ে আছে। এমনিতেই মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হলেই রাজধানীবাসীর দুর্ভোগের সীমা থাকে না। কারণ রাজধানীর অন্তত ১০৩টি স্পট বৃষ্টি হলেই পানির নিচে তলিয়ে যায়। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করেপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৬৫টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৩৮টি স্পট রয়েছে। এসব জায়গার সড়ক, ফুটপাথ ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে তলিয়ে থাকায় নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

গতকাল ভোর রাত থেকেই ঢাকায় থেমে থেমে ঝিরঝির ও কখনো মুষলধারে ভারী বৃষ্টি হয়। টানা ভারী বর্ষণে রাজধানীবাসীর জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে কাঁচাবাজারে আসা সাধারণ ক্রেতা- সবাই পড়েন ভোগান্তিতে। রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে বৃষ্টির পানি জমে তৈরি হয় কর্দমাক্ত পরিবেশ। হাঁটুসমান পানি ও পচা আবর্জনার দুর্গন্ধ চারপাশ সবার মধ্যে যেন বিবমিষা জাগিয়ে তোলে। সব মিলিয়ে নগরবাসী দুর্বিষহ অবস্থার শিকার হন। বৃষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। যাদের প্রতিদিন ঘর থেকে বের হয়ে জীবিকার সন্ধানে পথে নামতেই হয়, তাদের জন্য এই বৃষ্টি যেন বাড়তি এক শাস্তি। 

বাসা থেকে বের হলেই কোথাও জমে থাকা পানি, কোথাও ভাঙা রাস্তা, কোথাও আবার ম্যানহোলের মুখ পানির নিচে ঢেকে থাকায় আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করতে হয়। এরই মধ্যে কাঁচাবাজারগুলোতে দেখা গেছে আরেক ভিন্ন চিত্র। পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে বিক্রি হচ্ছে সবজি, মাছ-মাংস। আর ক্রেতাদেরও বাধ্য হয়ে সেই নোংরা পানির ভেতর দিয়েই বাজার করতে হচ্ছে। বিশেষ করে কাঁচাবাজারে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ। অনেকেই পরিবারের জন্য বাজার করতে এসে কাদা-পানি এড়িয়ে চলতে না পেরে বিরক্তি প্রকাশ করেন। কারও হাতে ছাতা, পায়ে স্যান্ডেল, কেউ আবার পলিথিন মুড়িয়ে কোনোভাবে পা বাঁচিয়ে হাঁটছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাদা, পানি আর পিচ্ছিল মেঝের কাছে সবাই প্রায় অসহায়।

অন্যদিকে ছুটির দিন হওয়ায় সড়কে যানবাহনের চাপ তুলনামূলক কম থাকলেও সড়কে যানবাহন চলাচল করেছে ধীরগতিতে। কোথাও কোথাও সড়কে হাঁটুপানি জমে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। আবার অনেক সড়কে পানির কারণে যানবাহন বিকল হয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়ে যায়। ফলে কর্মস্থল বা গন্তব্যে পৌঁছাতে যাত্রীদের অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়েছে। অনেককেই আবার ছাতা বা রেইনকোট ছাড়াই বৃষ্টিতে ভিজেই গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। আর গণপরিবহনের সংকট, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা এবং সড়কে জলাবদ্ধতার কারণে ভোগান্তির অন্ত ছিল না।

আর যাত্রী সংকটে আয় কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলচালকরাও। বিশেষ করে টানা বর্ষণের প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। আবার মৌচাক ও নিউমার্কেটসহ বেশ কয়েকটি মার্কেটের ভেতরে বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ায় অনেক দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দোকানপাটে মানুষের উপস্থিতি অনেকটাই কম ছিল। ফুটপাথের দোকানগুলোতে পানি প্রবেশ করায় ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। বৃষ্টির কারণে ফুটপাথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কেনাবেচা কমে গেছে। ফলে তারা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী এক ব্যক্তি বলেন, সাপ্তাহিক বাজার করতে বের হয়েছি। কিন্তু বাজারে ঢুকেই দেখি পুরোটা কাদা আর পানিতে ভরা। বৃষ্টির দিনে তো বাজারে আসতেই হয়। ঘরে রান্না হবে, বাচ্চাদের খেতে হবে। কিন্তু এই কাদা-পানিতে বাজার করতে এসে খুব কষ্ট হয়। বাজারের ভেতরে হাঁটার জায়গা নেই, আবার সবজিও ভালোভাবে দেখা যায় না।

বাজারে শুধু ক্রেতা নন, বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে খুচরা ব্যবসায়ীদের জীবনেও। বাজারে পণ্য সাজিয়ে বসা বিক্রেতারা বলছেন, বৃষ্টির কারণে মাল আনতেই নাভিশ্বাস উঠছে। ভেজা রাস্তা, জলাবদ্ধতা সব মিলিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে সময় লেগেছে কয়েকগুণ বেশি। এতে পরিবহন খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনই পণ্য নামানো ও সাজানোতেও বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বৃষ্টির পানি দোকানের সামনে জমে থাকায় ক্রেতারা দাঁড়াতে চান না। ফলে বিক্রি কমে গেছে। আবার ভেজা পরিবেশে পণ্য দীর্ঘক্ষণ ভালো রাখা যায় না বলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

কারওয়ান বাজারের আহমদ নামের এক ফল ব্যবসায়ী বলেন, বৃষ্টির কারণে বাজারের ক্রেতার সংখ্যা অনেক কম। বেচা-বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে। আবার বিক্রি না করতে পারলে পচনশীল ফলগুলো পচে যাবে। তাই আমাদের উভয় সংকট। বাজারের কোথাও কোথাও রাস্তার গর্ত পানিতে ঢেকে থাকায় মানুষ হোঁচট খাচ্ছেন। আবার বাজারের প্রবেশমুখে কাদা জমে থাকায় এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে বাজার করতে এসে সময় যেমন বেশি লাগছে, তেমনই শারীরিক ক্লান্তিও বাড়ছে কয়েকগুণ।

নগর বিশ্লেষকরা মনে করেন, ঢাকার বড় সমস্যা শুধু বৃষ্টি নয়। সমস্যা হলো পানি নিষ্কাশনের অকার্যকর ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল হয়ে যাওয়া খাল-নালা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজব্যবস্থা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলার অভাব। ফলে বৃষ্টি হলেই রাস্তার পানি নামতে পারে না, ড্রেন উপচে পড়ে আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজার, সড়ক ও জনজীবনে। নগরের কাঁচাবাজারগুলোতে পরিকল্পিত ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উঁচু ওয়াকওয়ে ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই সেগুলো দুর্ভোগের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

পল্টন মোড় এলাকায় রিকশাচালক সুরুজ মিয়া বলেন, ঘরে চাল নেই। তাই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই সকালে রিকশা নিয়ে বের হয়েছি। যাত্রীও কম, আবার থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। দুপুর পর্যন্ত কোনোরকমে রিকশার জমা তুলেছি। সন্ধ্যা পর্যন্ত যা আয় হবে, তা দিয়ে বাজার করে বাসায় ফিরব।

জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকায় রোগী দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাদেকুল ইসলাম। 

তিনি বলেন, রিকশা ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ চাওয়া হচ্ছে। তাই গন্তব্যে যেতে সমস্যায় পড়েছি। বৃষ্টির কারণে হেঁটেও যেতে পারছি না। আবার ভাড়াও দ্বিগুণের বেশি। কীভাবে যাব ভেবে পাচ্ছি না। ওদিকে আমার ছোট ভাই হাসপাতালে। এখন কোনো উপায় না পেলে বৃষ্টির মধ্যে পায়ে হেঁটেই যেতে হবে।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ২৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। শুক্রবার সকাল ৬টায় ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ২৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৯৭ শতাংশ। আগামী ২৪ ঘণ্টা দেশের ওপর মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। 

উত্তর বঙ্গোপসাগরে মৌসুমি বায়ু প্রবল অবস্থায় বিরাজ করায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ স্থানে অস্থায়ী দমকা হাওয়া, বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণেরও আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী রাজধানীতে গতকাল দিনভর দফায় দফায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও বজ্রসহ বৃষ্টি হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ঢাকাসহ দেশের ১৪টি অঞ্চলে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। 

একই সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের শঙ্কায় সংশ্লিষ্ট নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর নৌহুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। সতর্কবার্তায় রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট অঞ্চলের নদীবন্দরগুলোকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও


  বিষয়:   বৃষ্টি  জলাবদ্ধ  নগরী  ভোগান্তি  রাজধানী 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: