জনবহুল এই দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ কর্মক্ষম বয়সে রয়েছে। এই জনসংখ্যাগত বাস্তবতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় সুযোগ তৈরি করেছে। আবার কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও নগর ব্যবস্থাপনায় সৃষ্টি করেছে ব্যাপক চাপ। দেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সেই অনুপাতে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি এবং কর্মসংস্থানের অসামঞ্জস্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা না গেলে বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা জনমিতিক সুবিধা ধীরে ধীরে জনমিতিক চাপে পরিণত হতে পারে। দেশের জনবহুল জনসংখ্যা নগরায়ণও নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে জনসংখ্যার চাপ বাড়ার ফলে আবাসন সংকট, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবায় চাপ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকা থেকে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনও নগর জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। ফলে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাধীনতার পর পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। জন্মহার কমেছে, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ ঘটেছে। তবে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জনসংখ্যার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ, সুস্থ ও উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা।
অন্যদিকে জনসংখ্যার এই বিশাল অংশই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। জাতিসংঘের ভাষায়, এটি একটি ‘উইন্ডো অব অপরচুনিটি’। সঠিক শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা, তথ্যপ্রযুক্তি সক্ষমতা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা গেলে এই তরুণরাই আগামী দিনের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘তরুণদের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি।’ দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে।
১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির গভর্নিং কাউন্সিল বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ১১ জুলাইকে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯০ সালে প্রথমবারের মতো ৯০টি দেশে দিবসটি পালিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও দিবসটি গুরুত্বের সঙ্গে উদযাপিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়; প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা এবং আধুনিক কৃষিতে দক্ষ জনবল তৈরির ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
জনসংখ্যা উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি পরিবার পরিকল্পনা। স্বাস্থ্য অধিদফতর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিকল্পিত পরিবার শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য, পারিবারিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নত জীবন নিশ্চিত করার কার্যকর উপায়। মাতৃস্বাস্থ্য, নিরাপদ প্রসব, নবজাতকের পুষ্টি এবং প্রসব-পরবর্তী সেবায় বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনদক্ষতা শিক্ষাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। অল্প বয়সে বিয়ে, অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ এবং পুষ্টিহীনতা কমাতে বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, প্রযুক্তি আসক্তি এবং মানসিক চাপ মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া জনসংখ্যা উন্নয়ন সম্ভব নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারীরা পরিবার পরিকল্পনা, সন্তানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় অধিক সচেতন ভূমিকা রাখেন। ফলে নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধকে জনসংখ্যা নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন নীতিনির্ধারকরা।
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস তাই শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হিসাব কষার দিন নয়; এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের উন্নয়নের রূপরেখা নির্ধারণেরও উপলক্ষ। জনসংখ্যাকে যদি দক্ষতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মাধ্যমে মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তবে সেটিই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি। আর পরিকল্পনার ঘাটতি থাকলে একই জনসংখ্যা হয়ে উঠতে পারে উন্নয়নের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ সময়ের আলোকে বলেন, পরিবার পরিকল্পনার সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতায় বিনিয়োগ করতে হবে। পরিকল্পিত জনসংখ্যাই পারে টেকসই, সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলতে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও