স্বঘোষিত সোমালিল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের বারবেরা শহরের উপকণ্ঠে লোকচক্ষুর আড়ালে চলছে এক বিশাল নির্মাণযজ্ঞ। এই উপকূলীয় শহরটি মূলত তার নতুন পোর্ট টার্মিনালের জন্য পরিচিত। টার্মিনালটি এ অঞ্চলের অর্থনীতির লাইফলাইন। তবে শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে রয়েছে এর আরেকটি বড় কৌশলগত সম্পদ। তা হলো বারবেরা বিমানবন্দর। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলা- সোমালিল্যান্ডের এই তিন মিত্র দেশের জন্য একটি যৌথ সামরিক ঘাঁটি তৈরি করতে এখন এই বিমানবন্দরটি ব্যাপক সংস্কারের মুখে রয়েছে।
এই তৎপরতার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর, সোমালিল্যান্ডের স্বাধীনতাকে ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এই আকস্মিক কূটনৈতিক পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো এডেন উপসাগরে ইসরাইলের একটি অগ্রবর্তী আউটপোস্ট স্থাপন করা।
এলাকাটি ইয়েমেন উপকূলের কাছাকাছি, যেখানে সক্রিয় রয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। ইরান-সমর্থিত এই শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী গত ২৮ মার্চ তেল আবিবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তারা এখন বাব-এল-মান্দেব প্রণালির সামুদ্রিক যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে, যা ইসরাইল ও আমেরিকার জন্যই রেডলাইন।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে মন্ডের হাতে আসা স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, রানওয়ের দক্ষিণ দিকে অন্তত তিনটি স্থানে বিশাল খননকাজ চলছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে বালুময় মাটিতে অন্তত ১৮টি বড় পরিখা খনন করা হয়েছে। ইউরোপীয় নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, ঘাঁটির ভেতরে মাটি খুঁড়ে তৈরি করা এই ভূগর্ভস্থ হ্যাঙারগুলো মূলত গোলাবারুদ রাখার গোপন ডিপো বা জ্বালানি ট্যাঙ্ক। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, পরিখাগুলো প্রথমে কনটেইনার দিয়ে ভর্তি করা হয়েছে, তারপর আবার মাটিচাপা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সামরিক বিশেষজ্ঞ নিশ্চিত করেছেন, এই গোলাবারুদের ডিপো তৈরির কাজটি করছে আরব আমিরাত। ২০১৭ সালে সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে দেশটি, যার মধ্যে এই বিমানবন্দরটি সামরিক কাজে ব্যবহারের অনুমতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই বারবেরা রুট ব্যবহার করেই গত ৭ জানুয়ারি ইয়েমেনের সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নেতা ও নিজেদের ঘনিষ্ঠ মিত্র আইদারুস আল-জুবাইদিকে ইয়েমেন থেকে নিরাপদে সরিয়ে এনেছিল আমিরাত।
বারবেরা বিমানবন্দরের একজন কর্মীর পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নিশ্চিত করেছেন, আবুধাবি আসলে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হয়েই এই ঘাঁটি নির্মাণের কাজ বাস্তবায়ন করছে। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ২৭ জানুয়ারির এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে মাটির স্তূপ উচুঁ করে বেশ কিছু প্ল্যাটফর্ম তৈরির যে দৃশ্য স্যাটেলাইট চিত্রে ধরা পড়েছে, তা থেকে ইঙ্গিত মেলে যে সেখানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপনের জোরালো প্রস্তুতি চলছে। বর্তমানে আমিরাতি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা উত্তর সোমালিয়ার পুন্টল্যান্ড অঞ্চলের বোসাসো বিমানবন্দরের সঙ্গে এই বন্দোবস্ত মিলে যায়। সেখানে ২০২৫ সালের মার্চে ইসরাইলের তৈরি এএল/এম-২০৯৪ রাডার মোতায়েন করেছিল আরব আমিরাত।
ইসরাইল ও সোমালিল্যান্ড উভয় পক্ষই প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা অস্বীকার করলেও মাঠ পর্যায়ে সহযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। সোমালিল্যান্ডের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণের জন্য গোপনে তেল আবিব সফর করেছেন। অন্যদিকে ইসরাইলি সামরিক প্রতিনিধি দল সোমালিল্যান্ডের রাজধানী হারগেইসা ও বারবেরা পরিদর্শন করেছে।
বারবেরার মূল আকর্ষণ এর কৌশলগত অবস্থান। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশদ্বারে অবস্থিত এই বিমানবন্দরের রানওয়ে আফ্রিকার দীর্ঘতম রানওয়েগুলোর একটি। চার কিলোমিটারেরও বেশি লম্বা এই রানওয়ে সত্তরের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন তৈরি করেছিল। ২০১৭ সালে আমিরাত এর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বারবেরার সামরিক অবকাঠামো উন্নত করার কাজ শুরু হয়। রানওয়ে সংস্কার করা হয়, তৈরি করা হয় বিশাল সামরিক হ্যাঙার। এর কাছাকাছি যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহী রণতরি নোঙর করার জন্য নৌ-জেটিও নির্মাণ করা হয়। প্রায় এক দশক পর, বাব-এল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব যখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছে, তখন এই ঘাঁটির পরিধি আরও বাড়ানো হচ্ছে।
বর্তমানে ঠিক কোন কোন দেশের সশস্ত্র বাহিনী এই সুবিধাগুলো ভোগ করবে, তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। বিমানবন্দরটি যৌথভাবে সোমালিল্যান্ড ও আরব আমিরাতের মালিকানাধীন হলেও বারবেরায় ইসরাইলি সামরিক মিশনের উপস্থিতি দেখা গেছে। সেখানে তারা সোমালিল্যান্ড সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধানের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। বিমানবন্দরটি এতদিন বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন জনসাধারণের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সংযোগ সড়কটিও।
পূর্ব আফ্রিকাভিত্তিক একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দলগুলো ইতিমধ্যেই এই ঘাঁটি পরিদর্শন করছে। তারা একে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালানোর লঞ্চ প্যাড হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এ ছাড়া মার্কিন আফ্রিকার কমান্ড আফ্রিকমের প্রতিনিধি দলও ঘন ঘন এই এলাকা সফর করছে। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর আফ্রিকম প্রধান জেনারেল ড্যাগভিন অ্যান্ডারসনকে বারবেরার টারমাকে দেখা গেছে।
জিবুতির বিকল্প খোঁজার ইচ্ছা প্রকাশে আমেরিকা কখনোই কোনো লুকোছাপা করেনি। জিবুতির মার্কিন ঘাঁটিটি ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত চীনের প্রথম বিদেশি সামরিক ঘাঁটির খুব কাছাকাছি অবস্থিত, যা ওয়াশিংটনের জন্য অস্বস্তিকর। তা ছাড়া হুথিদের পাল্টা হামলার ভয়ে জিবুতি তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইয়েমেনে কোনো মার্কিন হামলা চালানোর অনুমতি দেয় না। তবে সোমালিল্যান্ড এই শর্তে রাজি হতে প্রস্তুত। কারণ যেকোনো মূল্যে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য তারা এখন মরিয়া।
সময়ের আলো/এসএকে