তুরস্কের কাছে থাকা রাশিয়ার তৈরি অত্যাধুনিক ‘এস-৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কাছে বিক্রির প্রস্তাবকে ‘ইতিবাচক দৃষ্টিতে’ দেখছে রুশ সরকার। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-কে তথ্যটি নিশ্চিত করেছে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছে যে, এ সংক্রান্ত আলোচনা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
২০১৯ সালে তুরস্ক কর্তৃক রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনা আঙ্কারার জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই ক্রয়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পঞ্চম প্রজন্মের ‘এফ-৩৫’ ফাইটার জেট প্রোগ্রাম থেকে তুরস্ককে বাদ দেয় এবং আঙ্কারার প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর ধারাবাহিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা ছয়টি এফ-৩৫ জেট এখনও তাদের স্টোরেজে আটকে রাখা হয়েছে, কারণ ২০২০ সালের মার্কিন আইনের মাধ্যমে এগুলো তুরস্কের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া অবরুদ্ধ করা হয়েছিল।
২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর ওয়াশিংটন ও আঙ্কারার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোড়া লাগতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় এস-৪০০ সংকট সমাধান এবং এফ-৩৫ প্রোগ্রামে তুরস্কের ফিরে আসার বিষয়টি দুই দেশের আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘২০২০ ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট’ (এনডিএএ) অনুযায়ী, এফ-৩৫ ফাইটার জেট পেতে হলে আঙ্কারাকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের কাছে আর এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নেই। একই সঙ্গে এই আইনটি ২০১৯ সালে ট্রাম্প কর্তৃক তুরস্কের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্তগুলোকেও আরও কঠিন করে তুলেছে।
গত দেড় বছর ধরে ওয়াশিংটন ও আঙ্কারা এই সংকটের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করছে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, একটি প্রস্তাব ছিল এস-৪০০-এর মূল যন্ত্রাংশগুলো সরিয়ে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি নিরাপদ স্থানে রেখে সেগুলোকে অকার্যকর করে রাখা। কিন্তু পরবর্তীতে এই বিকল্পটি চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে পর্যাপ্ত মনে হয়নি, কারণ এটি শুধু আঙ্কারার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার পথ সুগম করত, চিরতরে নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে পারত না। রুশ ও তুর্কি সূত্রগুলো মিডল ইস্ট আই-কে জানিয়েছে, এই সামরিক প্রযুক্তি তৃতীয় কোনো দেশ অর্থাৎ সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে বিক্রি করার বিষয়ে গত কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলছে।
গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে ক্রেমলিন নিশ্চিত করেছে যে, তারা এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৃতীয় কোনো দেশের কাছে বিক্রির বিষয়ে তুরস্কের সঙ্গে আলোচনা করছে। রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এ নিয়ে আলোচনা আপাতত অব্যাহত থাকবে।
একটি রুশ সূত্র জানিয়েছে, ‘তৃতীয় দেশের কাছে এই সিস্টেম বিক্রির বিষয়ে তুরস্কের প্রস্তাবের জবাবে মস্কোর উত্তর ছিল : কেন নয়?’ তবে রায়ের সুনির্দিষ্ট কিছু বিশদ বিবরণ এখনও চূড়ান্ত করা বাকি রয়েছে এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। সূত্রটি আরও যোগ করে, যদি সংযুক্ত আরব আমিরাত শেষ পর্যন্ত এটি ক্রয় করে, তবে আঙ্কারার সঙ্গে সই হওয়া চুক্তির শর্তগুলো রাশিয়ার সম্পূর্ণরূপে মেনে চলা এবং তা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। মস্কো বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।
বেশ কয়েকটি তুর্কি সূত্র উল্লেখ করেছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যেই রাশিয়ার তৈরি ‘প্যান্টসির’ এর মতো বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। তারা আরও জানায়, আবুধাবি তাদের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করতে বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের অস্ত্র ক্রয়ের উৎস বহুমুখী করছে। তবে একজন ইউরোপীয় বিনিয়োগকারী মিডল ইস্ট আই-কে বলেছেন, চলমান সংঘাতের সময় ইরানের প্রতি রাশিয়ার সমর্থনের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ার মধ্যে অভ্যন্তরীণ তীব্র উত্তেজনা রয়েছে। কারণ তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে।
তবে এস-৪০০ বিক্রির এই চুক্তিটি তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সম্পাদিত হওয়ায় এর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না। সূত্রগুলো জানিয়েছে, পূর্বের কিছু প্রতিবেদনের দাবি সত্ত্বেও মস্কো পূর্বে তুরস্কের কাছ থেকে এই সিস্টেমটি ফেরত নিতে অস্বীকার করেছিল। গত শুক্রবার এ বিষয়ে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য তুরস্কের একটি পরিকল্পিত পাবলিক ঘোষণা দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয়। তবে আঙ্কারার পক্ষ থেকে এই বাতিলের সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করা হয়নি।
এই চুক্তিতে সায় দেওয়ার পেছনে রাশিয়ার মূল উদ্দেশ্য কী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে আঙ্কারার অভ্যন্তরীণ মহল মনে করছে, এর বিনিময়ে মস্কো তুরস্কের কাছ থেকে কয়েকটি ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাড় চাইতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস চুক্তিটি এখনও নবায়ন করা হয়নি এবং এ বিষয়ে দুই দেশের আলোচনা চলমান।
সময়ের আলো/এসএকে