দাবদাহ দাবানলে বিপর্যস্ত দক্ষিণ ইউরোপ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

দক্ষিণ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবারের গ্রীষ্মকালীন দাবদাহ ও লাগামহীন দাবানল মিলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই দুটো বিপদ একসঙ্গে

2026-07-13T03:24:22+00:00
2026-07-13T03:24:22+00:00
 
  সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
দাবদাহ দাবানলে বিপর্যস্ত দক্ষিণ ইউরোপ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৩:২৪ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
দক্ষিণ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবারের গ্রীষ্মকালীন দাবদাহ ও লাগামহীন দাবানল মিলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই দুটো বিপদ একসঙ্গে আঘাত হানায় সাধারণ মানুষের জীবন, কৃষিকাজ, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে, গত বৃহস্পতিবার স্পেনের ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি আলমেরিয়া নামক এলাকায় শুরু হওয়া দাবানল এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সেখানকার মাটি ও গাছপালা এতটাই শুকিয়ে গিয়েছিল যে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তা চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত এই আগুনে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, চারজন মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছেন এবং প্রায় ২০ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। 

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, অনেক মানুষ গাড়ি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলেও চারদিক থেকে আগুন ঘিরে ফেলায় তারা পড়েন বিপদে। এটি এ বছর ইউরোপের প্রথম দাবানল যেখানে এত বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। কিন্তু কেবল এই ঘটনা নয়; গত কয়েক সপ্তাহে পুরো দক্ষিণ ইউরোপে দাবানলে হাজার হাজার হেক্টর জমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

শুধু স্পেন নয়, ফ্রান্স ও পুর্তগালেও একই অবস্থা দেখা দিয়েছে। ফ্রান্সের পিরেনিস পর্বত অঞ্চলে লাগা আগুনের কারণে ১২ হাজারেরও বেশি মানুষকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। আবার পর্তুগালের মধ্যাঞ্চলে লাগা বড় আকারের দাবানলের ধোঁয়া এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে উপগ্রহের ছবিতে দেখা গেছে, সেই ধোঁয়া আটলান্টিক মহাসাগরের বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আগে ইউরোপে গ্রীষ্মকালে আগুন লাগলেও তা এত তাড়াতাড়ি, এত শক্তিশালী বা এত বড় আকার ধারণ করত না।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন আগুনের ঘটনা আগের চেয়ে অনেক আগেই শুরু হচ্ছে এবং তার তীব্রতাও বাড়ছে। এর আরেকটি কারণ হলো এ বছর শীতকালে ফ্রান্স ও স্পেনে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিল, যার ফলে প্রচুর ঘাস ও গাছপালা জন্মেছিল। কিন্তু পরপর তিনবার দাবদাহে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি হয়ে যায় এবং সেই সব গাছপালা ও ঘাস দ্রুত শুকিয়ে শুষ্ক জ্বালানি হয়ে পড়ে। ফলে সামান্যতেই বিশাল আকারের আগুন ছড়িয়ে পড়ছে।

ইউরোপীয় বন দাবানল তথ্য ব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ৩০ হেক্টরের বেশি জায়গায় মোট ৩১৪টি দাবানল লেগেছে, যা গত বছর একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং ২০১৬ সালের পর এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যা। ৮ জুলাই পর্যন্ত মোট প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে, যেখানে গত ২০০৬ সাল থেকে গড়ে প্রতি বছর মাত্র ১ লাখ হেক্টরেরও কম জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলের মানুষ শহরে চলে যাওয়ায় বহু জমি পরিচর্যা না পেয়ে পড়ে থাকে, যার কারণে সেখানে শুকনো গাছপালা জমে আগুনের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

এই আগুন শুধু বন ও জমি নষ্ট করছে না, বরং পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। আগুনের কারণে বাতাসে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও বিষাক্ত ধোঁয়া মিশছে, যা শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগসহ নানা ধরনের রোগ সৃষ্টি করছে। গত বছর স্পেন ও পর্তুগালে লাগা দাবানলের ধোঁয়ার কারণে প্রায় ২ হাজার মানুষ রোগে ভুগে মারা গেছেন বলে গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেইসব আগুন থেকে যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়েছিল, তা প্রায় ১০০০  মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বার্ষিক উৎপাদনের সমান ছিল।

এদিকে শুধু আগুন নয়, তাপপ্রবাহও নানাভাবে সমস্যা তৈরি করছে। ফ্রান্সে গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহে প্রচণ্ড তাপের কারণে প্রায় ২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগের সপ্তাহের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২৯ শতাংশ বেড়েছে, বিশেষ করে ৪৫ বছরের বেশি বয়সিদের মধ্যে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তাপ থেকে বাঁচতে ফ্রান্সের মানুষ ক্রমেই বাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র লাগাচ্ছেন। মাত্র দুই বছর আগে যেখানে ১৮ শতাংশ বাড়িতে এই যন্ত্র ছিল, এখন তা বেড়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে। কিন্তু এই যন্ত্রগুলো ব্যবহার করলে বাইরের পরিবেশে আরও তাপ ছড়ায়, ফলে শহরের তাপমাত্রা আরও বেড়ে যায়, বিশেষ করে রাতের বেলা এই সমস্যা বেশি দেখা দেয়।


প্রচণ্ড তাপের কারণে নদীর পানির তাপমাত্রাও বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে ফ্রান্সের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এসব কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখার জন্য নদীর পানি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পানি গরম হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিতে হচ্ছে। সিন নদীর পাশে অবস্থিত নোগেন্ট কেন্দ্রে মঙ্গলবার থেকে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, আর দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের আরেকটি কেন্দ্রে পানির তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ায় সম্পূর্ণ উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

কৃষিক্ষেত্রেও এই তাপ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে বড় ক্ষতি হচ্ছে। ভুট্টা ফসলের উৎপাদন প্রাক্কলন অনেকটাই কমিয়ে আনা হয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে মোট ভুট্টার ফলন আগের ধারণার চেয়ে প্রায় ৪৫ লাখ টন কম হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফ্রান্সে ভুট্টার ফলন হবে গত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এ ছাড়া গম ও বার্লি ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যও কমিয়ে আনা হয়েছে।

একই সঙ্গে দক্ষিণ ইউরোপে ক্রান্তীয় অঞ্চলের মতো আবহাওয়া তৈরি হওয়ায় মশা ও পোকামাকড়বাহিত রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৫১ থেকে ১৯৬০ সালের তুলনায় ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইউরোপে ডেঙ্গু জ্বরের মহামারি ছড়ানোর সম্ভাবনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। 

ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর মতো রোগগুলো যা আগে শুধু গরম অঞ্চলের দেশগুলোতেই দেখা যেত, এখন ইউরোপের শহর ও শীতল অঞ্চলেও তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে একের পর এক বিপদ জড়ো হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এর গভীর প্রভাব পড়ছে।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   দাবদাহ  দাবানল  বিপর্যস্ত  দক্ষিণ ইউরোপ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: