মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালার প্রতিনিধি। এই পৃথিবীকে সুন্দর, বাসযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখা মানুষের অন্যতম দায়িত্ব। ইসলাম শুধু নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের জীবন, সমাজ ও পরিবেশ সবকিছুর কল্যাণ নিশ্চিত করাই ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এ কারণেই গাছ লাগানোকে ইসলাম কেবল একটি সামাজিক কাজ হিসেবে নয়, বরং একটি নেক আমল ও সদকায়ে জারিয়া হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, বন উজাড়, বায়ুদূষণ এবং পানির সংকটের মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি। বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত সতর্ক করছেন যে, নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে পৃথিবীর পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। অথচ দেড় হাজার বছর আগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে গাছ লাগাতে, সবুজায়ন বাড়াতে এবং বৃক্ষ সংরক্ষণে উৎসাহিত করেছেন। এটি ইসলামের চিরন্তন সৌন্দর্যের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো মুসলমান একটি গাছ লাগায় কিংবা কোনো ফসল বপন করে, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা কোনো প্রাণী আহার করে, তখন তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।
এই হাদিস আমাদের একটি অসাধারণ শিক্ষা দেয়। একটি গাছ লাগানোর মাধ্যমে যতদিন মানুষ, পশুপাখি কিংবা অন্য কোনো প্রাণী উপকৃত হবে, ততদিন পর্যন্ত গাছ লাগানো ব্যক্তির আমলনামায় নেকি যোগ হতে থাকবে। পৃথিবীতে এমন খুব কম আমল রয়েছে, যার প্রতিদান মানুষের মৃত্যুর পরও দীর্ঘদিন চলতে থাকে। বৃক্ষরোপণ সেই বিরল আমলগুলোর অন্যতম। ইসলামে সদকায়ে জারিয়ার ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে আমলের সুফল দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ভোগ করে, সেই আমলের সওয়াবও অব্যাহত থাকে। একটি ফলের গাছ লাগানো হলে বহু বছর ধরে অসংখ্য মানুষ তার ফল খেতে পারে। পথিক তার ছায়ায় বিশ্রাম নিতে পারে। পাখি বাসা বাঁধতে পারে। পশুপাখি খাদ্য পেতে পারে। এমনকি গাছ থেকে উৎপন্ন অক্সিজেনের মাধ্যমে অগণিত মানুষ উপকৃত হয়। তাই একটি গাছ কেবল কাঠ বা ফলের উৎস নয়; এটি অসংখ্য নেকির উৎস। আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। নতুন নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বৃক্ষরোপণ হচ্ছে না। ফলে শহরগুলোতে তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিকতা নষ্ট হচ্ছে। নদী-খাল শুকিয়ে যাচ্ছে। বায়ুদূষণ বেড়ে মানুষের স্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে। এসব সমস্যা দূর করতে বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই।
ইসলাম কখনো অপচয় কিংবা ধ্বংসকে সমর্থন করে না। অকারণে গাছ কেটে পরিবেশের ক্ষতি করা ইসলামের দৃষ্টিতে অনুচিত। বরং গাছ লাগানো, পরিচর্যা করা এবং অকারণে বৃক্ষনিধন থেকে বিরত থাকা একজন মুমিনের দায়িত্ব। কারণ প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি এবং তাঁর তসবিহ পাঠ করে। তাই প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণও ইবাদতের অংশ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময়ও তোমাদের কারও হাতে একটি চারাগাছ থাকে এবং তা লাগানোর সুযোগ থাকে, তবে সে যেন তা লাগিয়ে দেয়’ (মুসনাদে আহমাদ)।
এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। পৃথিবীর শেষ মুহূর্তেও যদি একটি গাছ লাগানোর সুযোগ থাকে, তবে তাও অবহেলা করা যাবে না। অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে গাছ লাগানো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, শেষ সময়েও এর মূল্য কমে না। আমাদের সমাজে অনেকেই মনে করেন, গাছ লাগানো কেবল বন বিভাগের কাজ বা পরিবেশবাদীদের দায়িত্ব। অথচ ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তিকে এ বিষয়ে সচেতন হতে শিক্ষা দিয়েছে। একটি পরিবার বছরে অন্তত একটি ফলদ, একটি বনজ ও একটি ঔষধি গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, মসজিদ, এতিমখানা এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে যেমন পরিবেশ উপকৃত হবে, তেমনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও নেকির অংশীদার হবেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা জরুরি। একটি শিশুকে যদি শেখানো হয় ‘তুমি একটি গাছ লাগালে আল্লাহ তোমাকে সওয়াব দেবেন’, তবে সে শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেও গাছ লাগাতে আগ্রহী হবে। ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে পরিবেশ সচেতনতার এই সমন্বয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলবে।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক ও সবুজের দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বন উজাড়ের কারণে সেই পরিচয় আজ অনেকটাই ম্লান । তীব্র গরম, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এখন যদি আমরা ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণে এগিয়ে না আসি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি অনিরাপদ পরিবেশ উপহার দিতে হবে। তাই আজ একটি গাছ লাগানো মানে শুধু একটি চারা রোপণ নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবীর ভিত্তি স্থাপন। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও বৃক্ষরোপণকে একটি নিয়মিত আমলে পরিণত করা যেতে পারে। সন্তান জন্মদিনে, বিয়েবার্ষিকীতে, কোনো প্রিয়জনের স্মরণে কিংবা কোনো সফলতার উপলক্ষে একটি গাছ লাগানোর সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে। এতে সমাজে যেমন সবুজায়ন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি মানুষ নেকির একটি সহজ ও স্থায়ী পথ খুঁজে পাবে।
সবশেষে বলা যায়, গাছ লাগানো শুধু পরিবেশ রক্ষার উপায় নয়; এটি একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব, মানবিক কর্তব্য এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি সহজ মাধ্যম। একটি ছোট্ট চারা একদিন বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়, অসংখ্য মানুষকে ছায়া দেয়, ফল দেয়, প্রাণীদের আশ্রয় দেয় এবং পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে ভূমিকা রাখে। সেই সঙ্গে গাছ লাগানো ব্যক্তির আমলনামায় অবিরাম নেকি জমা হতে থাকে। তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে অন্তত বছরে কয়েকটি গাছ লাগানোর অঙ্গীকার করি, লাগানো গাছের যত্ন নিই এবং অন্যদেরও এ মহৎ কাজে উৎসাহিত করি। আমাদের হাতে রোপিত একটি গাছ হয়তো আগামী প্রজন্মের জন্য ছায়া, ফল, নির্মল বাতাস এবং আমাদের আখেরাতের জন্য অবিরাম সওয়াবের কারণ হয়ে থাকবে। ইনশাআল্লাহ।
শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ