পবিত্র কুরআনের সুরা আন-নামলের ৮৮ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহরই সৃষ্টি নৈপুণ্য, যিনি সবকিছুকে করেছেন সুষম।’ অর্থাৎ আল্লাহ প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টিকেই সুষম ও সুনিপুণভাবে সৃষ্টি করেছেন। পরিবেশ তার আপন গতিতে বহমান থেকে মানবজাতির দৈনন্দিন বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপকার করে যাচ্ছে। প্রকৃতি ও পরিবেশের এই সৃষ্টি মানবজাতির কল্যাণের জন্যই। তবে সেই পরিবেশ যখন মানুষের দ্বারা দূষিত হয়, তখন তা তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। রোগ-বালাইয়ের প্রাদুর্ভাব ও প্রকৃতির সুষম বণ্টনের বিচ্যুতি দেখে তা আজ স্পষ্ট প্রতীয়মান।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পরিবেশবিজ্ঞানীরা বৃক্ষরোপণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বৃক্ষরোপণে উৎসাহ প্রদান করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো বৃক্ষরোপণ করল, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এর বিনিময়ে তাকে এই বৃক্ষের ফলের সমপরিমাণ প্রতিফল দান করবেন’ (মুসনাদে আহমাদ)।
এ ছাড়া বৃক্ষনিধনে অনুৎসাহিত ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি (অকারণে) একটি কুলগাছ কাটবে, আল্লাহ তাকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫২৩৯)
পানিদূষণ আজ বিপদসীমায় উপনীত। মানুষের অধিকাংশ রোগ-বালাই দূষিত পানি ব্যবহার ও পান করার কারণে ঘটে থাকে। পানিদূষণ ও অপচয় প্রতিরোধে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর বাণী উচ্চারণ করে বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন আবদ্ধ পানিতে প্রস্রাব না করে’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৪৪)।
অন্য হাদিসে প্রবাহিত পানিতেও মূত্র বিসর্জনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য ও নির্মলতার প্রধান উপাদান হচ্ছে স্বচ্ছ ও মুক্ত বাতাস। দূষিত বাতাস তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধানতম কারণ। যত্রতত্র বর্জ্য নিষ্কাশন ও কারখানার দূষিত ধোঁয়ার কারণে বাতাস দূষিত হয়। এর প্রতিকার হাদিসে সুস্পষ্ট।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা অভিশাপ ডেকে আনে এরূপ তিনটি কাজ থেকে বিরত থাকো চলাচলের রাস্তায়, রাস্তার মোড়ে অথবা ছায়াদার স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করা।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৬)
শব্দদূষণ একটি সুস্থ পরিবেশে বিপর্যয় ঘটায়। এর ফলে রক্ত সঞ্চালনে ব্যাঘাত, উচ্চ রক্তচাপ, স্নায়ুতন্ত্রের রোগ, মাথা ব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। ইসলাম শব্দদূষণের ঘোর বিরোধী। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করো; নিশ্চয়ই কণ্ঠস্বরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হচ্ছে গাধার স্বর’ (সুরা লুকমান, আয়াত : ১৯)।
মানুষকে আল্লাহ দুনিয়াতে তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করলেও পরিবেশের প্রতি অনৈতিক আচরণের অনুমতি তাদের দেননি। পরিবেশ রক্ষা করা মানুষের একান্ত কর্তব্য। কিন্তু মানুষ তার দায়িত্ব ভুলে গিয়ে পরিবেশের যথেচ্ছ ব্যবহার শুরু করেছে। ফলস্বরূপ আজ নদী-নালা দূষিত, বনাঞ্চল বিলুপ্ত ও ওজোনস্তর ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে। এসব তাদেরই কর্মের প্রতিফল।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।’ (সুরা আর-রুম, আয়াত : ৪১)
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ও সর্বজনীন জীবনবিধান। জীবনের অন্য সব বিষয়ের মতো পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও এতে যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। চৌদ্দশ বছর পূর্বে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় ইসলাম যে নির্দেশনা প্রদান করেছে, তা প্রচলিত পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। মুসলিমরা এই উপদেশগুলো পালনের মাধ্যমে ইহকালীন পার্থিব লাভের পাশাপাশি পরকালীন সফলতা অর্জনেও লাভবান হতে পারে।
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়