প্রকৃতি মহান আল্লাহ তায়ালার অসীম কুদরতের এক অনন্য নিদর্শন। কখনো নির্মল আকাশ, স্নিগ্ধ বৃষ্টি ও সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি মানুষের জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আসে; আবার কখনো অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও ভয়াবহ বন্যা মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
মুহূর্তের মধ্যেই জনপদ পরিণত হয় জলরাশিতে, ভেঙে যায় ঘরবাড়ি, তলিয়ে যায় ফসলের ক্ষেত, ধ্বংস হয় জীবিকার অবলম্বন এবং লাখ লাখ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রোগব্যাধি ও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তাদের প্রতিটি দিন হয়ে ওঠে এক কঠিন সংগ্রাম। এমন সময়ে বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো কেবল মানবিক সহানুভূতির বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি একজন মুমিনের ঈমানের দাবি।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা নেককাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ২)। এই আয়াত ইসলামি সমাজব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি ঘোষণা করেছে। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসা নিঃসন্দেহে সৎকাজের অন্তর্ভুক্ত। তাই বন্যাকবলিত মানুষের সাহায্যে অংশগ্রহণ করা কেবল একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি আল্লাহর নির্দেশ পালনও বটে।
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা সাহাবায়ে কেরামের আত্মত্যাগের প্রশংসা করে বলেন, ‘তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও অন্যদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়’ (সুরা হাশর, আয়াত : ৯)। এই মহান চরিত্রই একজন প্রকৃত মুসলমানের পরিচয়। নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের কিছু অংশ ত্যাগ করে বন্যার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া, তাদের জন্য বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা এই আয়াতেরই বাস্তব প্রতিফলন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানবসেবার মর্যাদা বর্ণনা করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে নিয়োজিত থাকে, আল্লাহ তায়ালা তার প্রয়োজন পূরণ করেন’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৪৪২)। আল্লাহর সাহায্য লাভের অন্যতম উপায় হলো মানুষের উপকার করা। তাই বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানে আল্লাহর রহমত ও সাহায্য লাভের পথ সুগম করা।
অন্য একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতায় মুমিনরা একটি দেহের ন্যায়। দেহের একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে পুরো দেহ জেগে থাকে এবং কষ্ট অনুভব করে’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১১)। এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয়, দেশের এক প্রান্তে মানুষ যখন বন্যায় অসহায়, তখন অন্য প্রান্তের মুসলমান নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। তাদের কষ্ট অনুভব করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা ঈমানেরই দাবি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের একটি দুনিয়াবি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)। অতএব ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো, গৃহহীনকে আশ্রয় দেওয়া, অসুস্থের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং অসহায় শিশুর মুখে হাসি ফোটানো- এসব কাজ কেবল মানবিকতা নয়; বরং আখেরাতের মুক্তিরও পাথেয়।
আজ আমাদের সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠন, মসজিদ-মাদরাসা, তরুণ সমাজ এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের উচিত বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সাহায্য শুধু অর্থ দিয়েই নয়; শ্রম, সময়, দক্ষতা, চিকিৎসাসেবা, উদ্ধারকাজ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা কিংবা আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমেও হতে পারে। ইসলামে সামর্থ্যানুযায়ী সহযোগিতাই প্রকৃত দায়িত্ব। তবে ত্রাণ বিতরণে অবশ্যই ইখলাস, সততা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। লোক দেখানো, প্রচারের উদ্দেশ্যে দান করা কিংবা অসহায় মানুষের আত্মসম্মান ক্ষুণ্ন করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
আল্লাহ তায়ালা একনিষ্ঠতার সঙ্গে তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই সব আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন। বন্যা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা, আর এই পরীক্ষায় বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের ঈমান, মানবতা ও নৈতিকতার পরীক্ষা। আসুন, বিপদগ্রস্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে যার যা সামর্থ্য আছে তা নিয়ে এগিয়ে আসি। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে অসহায় মানুষের প্রকৃত খেদমত করার তওফিক দান করুন, আমাদের দান-সদকা কবুল করুন এবং দেশ ও জাতিকে সব প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে হেফাজত করুন।
প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম
সময়ের আলো/আআ