বিমানের আবিষ্কারক কে? প্রথমেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে আমেরিকার দুই ভাইয়ের নাম। ১৯০৩ সালে উইলবার রাইট এবং অরভিল রাইট নামক মার্কিনি দুই ভাই সফলভাবে রাইট ফ্লায়ার বা ‘ফ্লায়ার-১’ নামক সফল নিয়ন্ত্রিত ইঞ্জিনচালিত বিমান উড্ডয়ন করেন।
কিন্তু ইতিহাস কী বলে? আকাশে উড্ডয়নের ধারণা কি বিংশ শতাব্দীতেই সর্বপ্রথম? না! এই ইতিহাস জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আরও এক হাজার বছর আগে। আমাদের আজকের গল্প এমন একজন সম্পর্কে, যিনি যন্ত্রচালিত বিমান তৈরি হওয়ার এক হাজার বছর আগেই আকাশে সফলভাবে উড্ডয়ন করেছিলেন। নাম তার আব্বাস ইবনে ফিরনাস। নবম শতাব্দীতে স্পেনের মাটিতে রেশম, কাঠ এবং পাখির আসল পালক দ্বারা নির্মিত এক জোড়া ডানার সাহায্যে তিনি আকাশে সফলভাবে উড়ে আবার নিজ জায়গায় ফিরে এসেছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, ৬৫ থেকে ৭০ বছর বয়সে ইবনে ফিরনাস স্পেনের কর্ডোভার কাছে অবস্থিত জাবাল আল আরুস পর্বতের খাড়া শৃঙ্গ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাতাসে উড়ে বেড়িয়েছিলেন। তিনি কমপক্ষে ১০ মিনিট বাতাসে উড্ডীন ছিলেন।
আব্বাস ইবনে ফিরনাসের পুরো নাম আব্বাস আবু আলকাসিম ইবনে ফিরনাস ইবনে ইরদাস আল তাকুরিনি। তিনি ছিলেন বারবার বংশের লোক। তার জন্ম ৮১০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন মুসলিম জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র স্পেনে। তিনি ছিলেন একাধারে একজন প্রকৌশলী, উদ্ভাবক, উড্ডয়ন বিশারদ, চিকিৎসক, কবি, সুরকার, পদার্থবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তার জন্মস্থান ছিল স্পেনের রোনদায়, যা এখন স্পেনের একটি অন্যতম পর্যটন শহর। তিনি যদিও রোনদায় জন্মগ্রহণ করেন, কিন্তু জ্ঞানের প্রতি তার আসক্তি থেকে তিনি রোনদা থেকে কর্ডোভায় গমন করেন। তখন বাগদাদের দারুল হিকমাহ ছিল মুসলিম জ্ঞানপিপাসুদের তীর্থস্থান। তিনি সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর জ্ঞান আহরণ করেন ও ফিরে এসে কর্ডোভায় বসবাস শুরু করেন।
আব্বাস ইবনে ফিরনাস সম্পর্কে লোকমুখে বিভিন্ন গল্প শোনা গেলেও ১৬-১৭শ শতাব্দীর বিখ্যাত আলজেরীয় ঐতিহাসিক আল-মাকারির লেখায় তার ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যায়। এ ছাড়া ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রসঙ্গে মন্তব্য পাওয়া যায় সমসাময়িক কর্ডোভার আমির প্রথম মুহাম্মদের রাজকবি মুমিন ইবনে সাইদের কবিতায়। ইবনে সাইদ ফিরনাস সম্পর্কে কবিতায় লিখেন, ‘শকুনের পালক দ্বারা আবৃত হলে তিনি ফিনিক্সের চেয়েও দ্রুত ওড়েন।’ ইবনে ফিরনাস তার উদ্ভাবিত উড্ডয়ন যন্ত্রে পালক ও সিল্কের ব্যবহার করেছিলেন।
ইবনে ফিরনাস ৬৫ বছর বয়সে স্পেনের কর্ডোভার নিকটবর্তী রুসাফা এলাকার আরুস পর্বত থেকে তার উদ্ভাবিত উড্ডয়নযন্ত্র সহকারে শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কর্ডোভা থেকে অনেক মানুষ তার আকাশে ওড়া দেখার জন্য ভিড় জমিয়েছিলেন। ইবনে ফিরনাস তাদের উদ্দেশে বলেন, এখান থেকে ওড়ার পর যদি সব ঠিক থাকে তবে আমি এখানেই আবার ফিরে আসব। তার উড্ডয়নযন্ত্র সফলভাবেই কাজ করে এবং প্রায় দশ মিনিট তিনি তার যন্ত্রের সাহায্যে উড়তে সমর্থ হন।
কিন্তু সফলভাবে উড়লেও তিনি একটু ভুল করেছিলেন। আল-মাকারি উল্লেখ করেন, তিনি তার শরীরকে পালক দ্বারা আবৃত করেন এবং তার শরীরে কয়েকটি পাখা যোগ করেন। তারপর শূন্যে ভেসে পড়েন। যারা তার এই উড্ডয়ন প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের লেখনীতে পাওয়া যায়, তিনি পাখার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য দূরত্ব অতিক্রম করেন এবং যেখান থেকে উড্ডয়ন শুরু করেছিলেন আবার সেখানে ফিরে আসেন। কিন্তু সফলভাবে অবতরণ করতে ব্যর্থ হন। এ সময় তিনি গুরুতর আহত হন। ইবনে ফিরনাস প্রাণে বেঁচে গেলেও পিঠে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন। তার বয়স তখন ৬৫ বছর।
এরপর তিনি তার উড্ডয়নযন্ত্রে ঠিক কী ভুল ছিল তা শনাক্তকরণে মনোনিবেশ করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, পাখি অবতরণের সময় লেজ এবং ডানাগুলোর সমন্বিতভাবে কার্যকারিতার মাধ্যমে গতি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু তিনি তার যন্ত্রে গতি কমানোর জন্য সেরকম কোনো লেজ বা বিকল্প পদ্ধতি রাখেননি। তারপরেও তিনি প্রায় ১২ বছর বেঁচে ছিলেন।
কিন্তু তার পক্ষে আর আকাশে ওড়া সম্ভব হয়নি। কারণ তিনি আর আগের মতো সুস্থতা লাভ করেননি। ৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে ইবনে ফিরনাস ইন্তেকাল করেন। ইবনে ফিরনাস মানুষের উড্ডয়নের ইতিহাসে কিংবা আকাশে ওড়ার পেছনে মানুষের যে প্রচেষ্টা তার একজন সফল স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তার প্রচেষ্টাকে বলা যায় আধুনিক উড়োজাহাজ আবিষ্কারের প্রথম ধাপ। মানুষকে ডানা মেলে ওড়ার স্বপ্ন দেখানো ইবনে ফিরনাস তাই ইতিহাসে অমর।
লেখক : আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/এসএকে