পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার নীরব সংকট ও প্রতিকার

মুফতি আশিকুল্লাহ বিন আসাদ

ইসলাম

মানুষ সভ্য হয়েছে পরিবারকে কেন্দ্র করে। পৃথিবীর ইতিহাসে রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা অর্থনীতির আগে যে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের জীবনকে নিরাপত্তা, পরিচয়, মূল্যবোধ

2026-07-09T12:40:42+00:00
2026-07-09T12:40:42+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬,
২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার নীরব সংকট ও প্রতিকার
মুফতি আশিকুল্লাহ বিন আসাদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪০ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানুষ সভ্য হয়েছে পরিবারকে কেন্দ্র করে। পৃথিবীর ইতিহাসে রাষ্ট্র, সমাজ কিংবা অর্থনীতির আগে যে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের জীবনকে নিরাপত্তা, পরিচয়, মূল্যবোধ ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছে সেটি হলো পরিবার। একটি শিশুর চরিত্র, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম, ধর্মীয় চেতনা এবং মানবিক গুণাবলির ভিত্তি গড়ে ওঠে পরিবারেই। তাই পরিবার যত শক্তিশালী হবে, সমাজ তত সুস্থ হবে; সমাজ যত সুস্থ হবে, রাষ্ট্রও তত স্থিতিশীল হবে। 

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো বর্তমান বিশ্বে পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন মানুষের জীবনকে সহজ করলেও মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়িয়েছে। একই ছাদের নিচে বসবাস করেও পরিবারের সদস্যরা আজ মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন। বৃদ্ধ পিতা-মাতা নিঃসঙ্গ, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে, সন্তানরা নৈতিক শিক্ষার পরিবর্তে ভার্চুয়াল জগতের প্রভাবে বড় হচ্ছে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে আনুষ্ঠানিকতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শুভেচ্ছা বিনিময়ে।

ইসলাম এই সংকটকে কেবল সামাজিক সমস্যা হিসেবে নয়; বরং ঈমান, নৈতিকতা ও আল্লাহর বিধান থেকে বিচ্যুত হওয়ার পরিণতি হিসেবে বিবেচনা করে। কুরআন ও সুন্নাহ পারিবারিক সম্পর্ককে এতটাই গুরুত্ব দিয়েছে যে, আল্লাহর ইবাদতের পরপরই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনগুলোর একটি হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ করো। তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে’ (সুরা আর-রোম : ২১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ (জামে তিরমিজি : ৩৮৯৫)


আল্লাহভীতি ও দ্বীনি মূল্যবোধের অবক্ষয় : পারিবারিক সংকটের সবচেয়ে গভীর কারণ হলো আল্লাহর স্মরণ ও দ্বীনি শিক্ষার অভাব। যখন একটি পরিবারে নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত, দোয়া, ইসলামি আদর্শ এবং আল্লাহভীতির পরিবেশ থাকে না, তখন সেখানে ধীরে ধীরে স্বার্থপরতা, অহংকার, অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয় প্রবেশ করে। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে সংকীর্ণ ও দুর্বিষহ।’ (সুরা ত্বহা : ১২৪)

আত্মকেন্দ্রিক জীবনবোধ ও ব্যক্তিস্বার্থের আধিপত্য : আগে পরিবারে ‘আমরা’ শব্দটির গুরুত্ব ছিল বেশি; এখন ‘আমি’ শব্দটি বড় হয়ে গেছে। আধুনিক ভোগবাদী সংস্কৃতি মানুষকে শেখাচ্ছে নিজের সুখই সর্বোচ্চ। ফলে ত্যাগ, দায়িত্ব, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা কমে যাচ্ছে। ইসলাম মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক নয়, দায়িত্বশীল হতে শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি : ৮৯৩)

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা : বর্তমান সমাজে সম্পত্তি, অর্থ কিংবা সামান্য মতবিরোধের কারণে ভাই ভাইয়ের সঙ্গে, সন্তান পিতা-মাতার সঙ্গে কিংবা আত্মীয় আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করছে। অথচ ইসলাম এটিকে অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি এমন করবে যে, ক্ষমতা পেলে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে?’ (সুরা মুহাম্মাদ : ২২)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম : ২৫৫৬)

ডিজিটাল আসক্তি ও যোগাযোগের সংকট : প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু পারিবারিক যোগাযোগকে দুর্বলও করেছে। আজ একই ঘরে বসে পরিবারের চারজন সদস্য চারটি ভিন্ন স্ক্রিনে ব্যস্ত। একসময় যেখানে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া, আলোচনা ও পরামর্শ করত, সেখানে এখন নীরবতা এবং ভার্চুয়াল ব্যস্ততা স্থান দখল করেছে। প্রযুক্তি নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা হলো তার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। পরিবারে যখন মোবাইল ফোন মানুষের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, তখন আবেগের বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে।

পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ববোধের অবক্ষয় : ইসলাম পিতা-মাতার অধিকারকে এত গুরুত্ব দিয়েছে যে, আল্লাহ নিজের ইবাদতের নির্দেশের পরপরই তাদের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার প্রতি উত্তম আচরণ করবে’ (সুরা আল-ইসরা : ২৩)। 

আজ অনেক বৃদ্ধ পিতা-মাতা অর্থের অভাবে নয়; সন্তানের সময়, ভালোবাসা ও যত্নের অভাবে কষ্ট পান। এটি শুধু সামাজিক ব্যর্থতা নয়; ইসলামি শিক্ষারও অবমাননা।

দাম্পত্য জীবনে দায়িত্ব ও সহনশীলতার অভাব : বিয়ে ইসলামে একটি পবিত্র অঙ্গীকার। কিন্তু বর্তমানে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই অধিকারের বিষয়ে সচেতন হলেও দায়িত্বের বিষয়ে অনেক সময় উদাসীন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা এবং পরামর্শের অভাব ছোট সমস্যাকেও বড় সংকটে রূপ দেয়। কুরআন দাম্পত্য সম্পর্ককে প্রতিযোগিতা নয়; বরং সহযোগিতা ও প্রশান্তির সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তাই পরিবার টিকিয়ে রাখতে অহংকার নয়, প্রয়োজন দায়িত্ববোধ। ইসলাম ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সব স্তরের জন্য বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা প্রদান করে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এসব নির্দেশনা অনুসরণ করা হলে পারিবারিক বন্ধন পুনরায় দৃঢ় করা সম্ভব।


পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা : বর্তমান সমাজে অধিকারের দাবি যত জোরালো, দায়িত্ব পালনের আগ্রহ তত কম। অথচ ইসলাম অধিকার ও দায়িত্বকে একই মুদ্রার দুই পিঠ হিসেবে বিবেচনা করেছে। স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা ও সন্তান প্রত্যেকের জন্য ইসলাম নির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে। যখন প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হবে, তখন অধিকাংশ পারিবারিক সংকট এমনিতেই দূর হয়ে যাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি : ৮৯৩)

পারিবারিক বন্ধনের সংকট মূলত অর্থনৈতিক নয়; এটি নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও মূল্যবোধের সংকট। পরিবারকে রক্ষা করা কেবল একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদতও বটে। যে পরিবার কুরআনের নির্দেশনা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শকে জীবনের ভিত্তি বানাবে, সেই পরিবারেই শান্তি, রহমত ও বরকত নেমে আসবে। আর এমন পরিবারগুলোর সমন্বয়েই গড়ে উঠবে একটি নৈতিক, সুস্থ ও মানবিক সমাজ।

লেখক : খতিব, মদীনাতুন নূর মসজিদ কমপ্লেক্স, শ্রীপুর, গাজীপুর

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   পারিবারিক  বিচ্ছিন্নতা  সংকট  প্রতিকার  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: