মানুষের ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ইতিহাস। ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনাপঞ্জি নয়; বরং এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ পথচলার দিকনির্দেশনা। যে জাতি নিজের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন, সে জাতি আত্মমর্যাদাবোধে দৃঢ় থাকে এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখতে পারে। বিপরীতে যে জাতি ইতিহাসবিমুখ হয়ে পড়ে, তারা একসময় নিজেদের শিকড়, আদর্শ ও পরিচয় হারিয়ে ফেলে। বর্তমান সময়ে নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ ইতিহাসচর্চা থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতিহাস মানুষের জন্য এক উন্মুক্ত শিক্ষালয়। এখানে রয়েছে সাফল্য-ব্যর্থতা, উত্থান-পতন, বিজয়-পরাজয় এবং নৈতিকতার অসংখ্য শিক্ষা। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষ বর্তমানকে মূল্যায়ন করতে শেখে এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ইতিহাসের গুরুত্ব তুলে ধরে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে পূর্ববর্তী জাতিগুলোর অসংখ্য ঘটনা বর্ণনা করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই তাদের কাহিনিতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে শিক্ষা’ (সুরা ইউসুফ : ১১১)। অর্থাৎ ইতিহাস কেবল তথ্য জানার বিষয় নয়; বরং তা শিক্ষাগ্রহণ ও আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুগে নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ ইতিহাসচর্চায় অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন বিনোদন এবং ভার্চুয়াল জগতের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি তাদের বইপড়া ও গবেষণার অভ্যাসকে সীমিত করে ফেলেছে। অনেক তরুণ-তরুণী বিশ্বসংস্কৃতির নানা খুঁটিনাটি সম্পর্কে অবগত হলেও নিজেদের দেশ, জাতি কিংবা ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সম্পর্কে খুব সামান্যই জানে। ফলে তাদের মধ্যে আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি হচ্ছে। ইতিহাসবিমুখতার প্রথম ও প্রধান ক্ষতি হলো আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলা। একটি জাতির ইতিহাসই তার পরিচয়ের ভিত্তি। ইতিহাস না জানলে মানুষ নিজের শিকড় সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যায়। তখন বিদেশি সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার অন্ধ অনুকরণে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে তুচ্ছ মনে করতে শুরু করে। এর ফলে জাতীয় চেতনা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সামাজিক বন্ধন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দ্বিতীয়ত ইতিহাসবিমুখ প্রজন্ম অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়। ইতিহাসের অন্যতম শিক্ষা হলো, অতীতের ভুল ও ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে সেগুলো থেকে বাঁচার চেষ্টা করা। কিন্তু ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতা মানুষকে একই ভুল বারবার করার দিকে ঠেলে দেয়। ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন বলেন, ‘ইতিহাসের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো ঘটনাপ্রবাহের কারণ ও শিক্ষা অনুধাবন করা।’ ইতিহাসের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হলে সমাজের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। তৃতীয়ত ইতিহাসবিমুখতা আদর্শ ও নেতৃত্বের সংকট সৃষ্টি করে। ইতিহাসের পাতায় অসংখ্য মনীষী, বীর, সংস্কারক ও আলেমের জীবনসংগ্রাম লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাদের ত্যাগ, সাহস, সততা ও আত্মনিবেদন নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। কিন্তু ইতিহাস না জানলে তরুণরা প্রকৃত আদর্শের সন্ধান পায় না।
তখন তারা সাময়িক জনপ্রিয়তা অর্জনকারী ব্যক্তি বা ভ্রান্ত মতাদর্শের অনুসরণে প্রভাবিত হতে পারে, যা তাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ইসলামের ইতিহাস থেকে বিমুখতা মুসলিম সমাজের জন্য আরও বড় সংকট। মুসলিম উম্মাহর অতীত গৌরব, জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা, সভ্যতা নির্মাণ এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে না দেওয়ার ফলে অনেকেই নিজেদের ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাচ্ছে। ফলে ইসলামের প্রতি গর্ববোধ দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অথচ ইসলামের ইতিহাসে রয়েছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন, ইমাম-মুজতাহিদ এবং অসংখ্য মনীষীর অনুকরণীয় জীবন, যা নতুন প্রজন্মের চরিত্র গঠনে অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইতিহাসবিমুখতার আরেকটি বড় ক্ষতি হলো সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির অবক্ষয়। ইতিহাস অধ্যয়ন মানুষকে বিশ্লেষণ, তুলনা এবং ঘটনাপ্রবাহের কারণ অনুসন্ধান করতে শেখায়। এতে যুক্তিবোধ ও বিচারক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ইতিহাসচর্চা কমে গেলে মানুষের চিন্তার পরিধি সংকুচিত হয় এবং তারা সহজেই অপপ্রচার, গুজব কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্যের শিকার হয়। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়।
এই সংকট উত্তরণে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পরিবারের অভিভাবকদের উচিত ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের ইতিহাস পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা। মহান ব্যক্তিদের জীবনী, ইসলামের ইতিহাস এবং দেশ-জাতির গৌরবগাথা শিশুদের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ইতিহাসভিত্তিক আলোচনা, বইপাঠ প্রতিযোগিতা, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। এ ছাড়া বর্তমান প্রজন্মকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ইতিহাসভিত্তিক ডকুমেন্টারি, অডিও-ভিডিও কনটেন্ট, গবেষণামূলক লেখা ও ডিজিটাল আর্কাইভের মাধ্যমে ইতিহাসকে আরও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা সম্ভব। তরুণদের মাঝে বইপড়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতেও সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন।
ইতিহাসবিমুখতা কোনো জাতির জন্য শুভলক্ষণ নয়। ইতিহাসকে উপেক্ষা করা মানে নিজের শিকড়কে অস্বীকার করা এবং ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া। নতুন প্রজন্মকে যদি সঠিক ইতিহাসচর্চার মাধ্যমে আত্মপরিচয়, আদর্শ ও মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে জাতিকে বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। তাই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইতিহাসচর্চাকে পুনরুজ্জীবিত করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।
লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ
সময়ের আলো/জেডআই