মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যিনি জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে গুনাহ বা ভুলের সম্মুখীন হননি। তবে ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি মানুষকে পাপের কারণে হতাশ হতে শেখায় না; বরং তওবার মাধ্যমে মহান রবের সান্নিধ্যে ফিরে আসার আহ্বান জানায়। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের জন্য তওবার দরজা সর্বদা উন্মুক্ত রেখেছেন এবং আন্তরিক তওবাকারীদের ক্ষমা করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করেছেন।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক অনন্য সুসংবাদ প্রদান করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'সেই মহান সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! যদি তোমরা কোনো পাপই না করতে তা হলে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের সরিয়ে এমন এক জাতিতে নিয়ে আসতেন, যারা পাপ করত; অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত, আর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিতেন' (মুসলিম, হাদিস: ২৭৪৯)।
এই হাদিসের মূল শিক্ষা হলো, আল্লাহ তায়ালা পাপকে ভালোবাসেন না; কিন্তু পাপী বান্দার আন্তরিক অনুতাপ, বিনম্র হৃদয়ে করা তওবা এবং ক্ষমা প্রার্থনাকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। মানুষ হিসেবে ভুল হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভুলের ওপর অটল থাকা কিংবা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, 'আপনি বলুন, হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছে! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন' (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)।
এই আয়াত মানবজাতির জন্য আশা, সাহস ও আশ্বাসের এক চিরন্তন ঘোষণা। গুনাহ যত বড়ই হোক না কেন, আন্তরিক তওবা করলে আল্লাহ তায়ালা তা ক্ষমা করতে সক্ষম। তাই কোনো পাপী বান্দার জন্য নিরাশার কোনো অবকাশ নেই। অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'আদম সন্তানের প্রত্যেকেই ভুলকারী;
আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা অধিক তওবা করে' (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৯৯)। তবে আলোচ্য হাদিসের অর্থ কখনোই এই নয় যে, মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করবে এবং পরে তওবা করবে। এমন মানসিকতা আল্লাহর প্রতি ধৃষ্টতা ও আত্মপ্রবঞ্চনার নামান্তর। প্রকৃত তওবা হলো গুনাহ থেকে অবিলম্বে বিরত হওয়া, কৃতকর্মের জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া, ভবিষ্যতে সেই গুনাহে আর ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা এবং মানুষের হক নষ্ট হয়ে থাকলে তা যথাযথভাবে আদায় বা ক্ষমা গ্রহণ করা।
আল্লাহ তায়ালা তওবাকারীদের মর্যাদা সম্পর্কে ঘোষণা করেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন' (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২২)। এটি একজন মুমিনের জন্য পরম সৌভাগ্যের সংবাদ। কারণ যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে তওবা করে, সে কেবল ক্ষমাই লাভ করে না; বরং আল্লাহর ভালোবাসারও অধিকারী হয়ে যায়। আজকের সমাজে অনেক মানুষ অতীতের গুনাহের কারণে হতাশ হয়ে পড়েন। কেউ মনে করেন, আমার মতো পাপীকে আল্লাহ আর ক্ষমা করবেন না।
অথচ এটি শয়তানের অন্যতম বড় প্রতারণা। শয়তান চায় মানুষ গুনাহের পর তওবা না করে হতাশার অতল গহ্বরে ডুবে যাক। কিন্তু একজন প্রকৃত মুমিন কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না। যতক্ষণ প্রাণ কণ্ঠাগত না হয় এবং কেয়ামতের বড় আলামত- পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া প্রকাশ না পায়, ততক্ষণ তওবার দরজা উন্মুক্ত থাকে।
অতএব আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের গুনাহের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে বিনম্রচিত্তে ক্ষমা প্রার্থনা করা, অধিক পরিমাণে ইসতিগফার পাঠ করা, নেক আমলের মাধ্যমে জীবনকে সমৃদ্ধ করা এবং সর্বদা আত্মশুদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। কেননা মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ভুল হওয়ায় নয়; বরং ভুলের পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসার মধ্যেই তার প্রকৃত সফলতা নিহিত।
প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম
সময়ের আলো/জেডি