ইসলামে শহিদের পরিচয়, প্রকার ও মর্যাদা

মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ

ইসলাম

শহিদ ইসলামের একটি মর্যাদাপূর্ণ পরিভাষা। ইসলামের দৃষ্টিতে শহিদ বলা ওই ব্যক্তিকে, যাকে মুশরিকরা হত্যা করেছে অথবা যাকে জিহাদের ময়দানে পাওয়া

2026-07-05T11:52:39+00:00
2026-07-05T11:52:39+00:00
 
  রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
ইসলামে শহিদের পরিচয়, প্রকার ও মর্যাদা
মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ
প্রকাশ: রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ১১:৫২ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
শহিদ ইসলামের একটি মর্যাদাপূর্ণ পরিভাষা। ইসলামের দৃষ্টিতে শহিদ বলা ওই ব্যক্তিকে, যাকে মুশরিকরা হত্যা করেছে অথবা যাকে জিহাদের ময়দানে পাওয়া গেছে এবং তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে; বা যাকে কোনো মুসলমান অন্যায়ভাবে হত্যা করেছে (কিতাবুল হেদায়া)। 

হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে জিগ্যেস করল, 'কেউ যুদ্ধ করে গনিমতের জন্য, কেউ যুদ্ধ করে খ্যাতির জন্য, আবার কেউ যুদ্ধ করে নিজের বীরত্ব ও অবস্থান প্রদর্শনের জন্য, তা হলে এদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদকারী? 

উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীন উচ্চ করার জন্য যুদ্ধ করবে, সেই আল্লাহর পথে জিহাদকারী' (বুখারি: ২৮১০)। পরে এ শব্দের মর্ম আরও বিস্তৃত হয়েছে। ফলে নবীজি (সা.) ওই সব ব্যক্তিকেও শহিদ বলে আখ্যায়িত করেছেন, যারা পেটের পীড়ায় বা পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে, ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে ইত্যাদি কারণে মৃত্যুবরণ করে। (আন-নিহায়া, ইবনে আসির: ২/৫১৩)

কুরআন ও সুন্নাহে শহিদদের অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। শাহাদাত ইসলামে কেবল একটি মৃত্যুর নাম নয়; বরং এটি এক মহান জীবন, এক অনন্য মর্যাদা এবং আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মানপ্রাপ্ত হওয়ার ঘোষণা। কুরআনুল কারিম ও হাদিসে নববীতে শহিদদের যে উচ্চ মর্যাদা ও অতুলনীয় ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে, তা অন্য কোনো শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে এত ব্যাপকভাবে পাওয়া যায় না। শহিদগণ মৃত নন, তারা জীবিত। 

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, 'যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তোমরা তাদের মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা অনুভব করতে পারো না' (সুরা বাকারা: ১৫৪)। শহিদ মৃত্যুর যন্ত্রণা অনুভব করে না। নবীজি (সা.) বলেছেন, 'শহিদ নিহত হওয়ার কষ্ট ততটুকুই অনুভব করে, যতটুকু তোমাদের কেউ পিঁপড়ার কামড় অনুভব করে' (তিরমিজি: ১৬৬৮)। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে শহিদদের জন্য বিশেষ রহমত, যেন দুনিয়ার কষ্ট তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।

শহিদদের জন্য জান্নাতে বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। বদর যুদ্ধের শহিদ হারিসা (রা.)-এর মা যখন তার সন্তানের অবস্থান জানতে চাইলেন, রাসুল (সা.) বললেন, 'হে হারিসার মা! জান্নাতে বহু উদ্যান রয়েছে, আর তোমার পুত্র জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করছে' (বুখারি: ২৮০৯)। কেয়ামতের দিন শহিদের রক্ত হবে মেশকের মতো ঘ্রাণযুক্ত। রাসুল (সা.) বলেন, 'আল্লাহর পথে যে ব্যক্তি আহত হয়, সে কেয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আসবে, তার রক্তের রং হবে লাল, কিন্তু ঘ্রাণ হবে মেশকের মতো' (বুখারি: ২৮০৯)। 

আল্লাহ তায়ালা শহিদদের প্রতি সন্তুষ্ট হন। হাদিসে এসেছে, 'শহিদগণ যখন আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যান, তখন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং তাদেরও সন্তুষ্ট করে দেন' (বুখারি: ২৮১০)। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, প্রত্যেক নিহত ব্যক্তিকেই 'শহিদ' বলা যায় না। বরং শহিদ হওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট শরয়ি শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক। ফিকহের কিতাবাদিতে এসব শর্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, যাতে শাহাদাতের মর্যাদা যথাযথভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটে। 

এখানে কয়েকটি মৌলিক শর্ত তুলে ধরছি- ক. শহিদ হওয়ার একটি মৌলিক শর্ত মুসলিম হওয়া। সুতরাং অমুসলিম ব্যক্তি শরিয়তে শহিদ হিসেবে গণ্য হয় না। খ. হত্যাটি অন্যায়ভাবে সংঘটিত হতে হবে। হত্যাটা জুলুম ও অন্যায়ের ভিত্তিতে হতে হবে। 

শহিদ হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, নিহত হওয়ার কারণে দিয়াত বা শরিয়ত নির্ধারিত আর্থিক ক্ষতিপূরণ ওয়াজিব না হওয়া। তবে হত্যাকাণ্ডে যদি প্রথমে কিসাস ওয়াজিব হয়, কিন্তু পরে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে তা দিয়াতে রূপান্তরিত হয়, তাহলে তা শাহাদাতের মর্যাদায় বাধা সৃষ্টি করে না। (বিনায়া শরহে হিদায়া: ৩/২৬৬)

ইসলামি ফিকহে শহিদ দুই প্রকার- ক. হাকিকি শহিদ। খ. হুকমি শহিদ (বিধানগত শহিদ)। এই বিভাজনটি হয়েছে শহিদদের ওপর দুনিয়াবি কিছু বিধান প্রয়োগকে কেন্দ্র করে- ১. হাকিকি শহিদ (প্রকৃত শহিদ): হাকিকি শহিদ তাকে বলা হয়, যার ওপর শহিদের দুনিয়াবি বিধানগুলো প্রযোজ্য হয়। অর্থাৎ তাকে গোসল দেওয়া হবে না, কাফন দেওয়া হবে না, বরং যে কাপড়ে সে শহিদ হয়েছে সেই কাপড়েই জানাজা পড়ে দাফন করা হবে। 


যেমন যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে গিয়ে শহিদ হয়েছে, অথবা যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও হাতে নিহত হয়েছে এই শর্তে যে, সে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেছে, সে চিকিৎসা গ্রহণ করেনি, কোনো অসিয়ত করেনি, আহত হওয়ার পর মৃত্যু পর্যন্ত এক ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সময় অতিবাহিত হয়নি ইত্যাদি। ২. হুকমি শহিদ (বিধানগত শহিদ): হুকমি শহিদ তাকে বলা হয়, যার ব্যাপারে হাদিসে শহিদ হওয়ার সুসংবাদ এসেছে। এ ধরনের ব্যক্তি আখেরাতে শহিদদের অন্তর্ভুক্ত হবেন, কিন্তু দুনিয়াতে তার ওপর সাধারণ মৃতের বিধানই প্রযোজ্য হবে। 

অর্থাৎ তাকে গোসল দেওয়া হবে, কাফন দেওয়া হবে। বিভিন্ন হাদিসে এ ধরনের শহিদের চল্লিশেরও বেশি প্রকার উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানে সব বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়। তার মধ্যে কয়েকটি হলো- পানিতে ডুবে মৃত্যু হওয়া, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা যাওয়া, কলেরা মহামারি, পেটের রোগে মৃত্যুবরণ করা, সফররত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা ইত্যাদি।

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   ইসলাম  শহিদ  পরিচয়  মর্যাদা 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: