‘তাহাজ্জুদ’ গভীর রাতের গোপন আমল। রাত যখন গভীর হয়, তখনই শুরু হয় তাহাজ্জুদের মোবারক ওয়াক্ত। এই সময় আল্লাহপ্রেমী বান্দারা আরামের ঘুম ত্যাগ করে মহান রবের সঙ্গে একান্ত আলাপে মগ্ন হন, হৃদয়ের সব আবেগ ঢেলে দিয়ে রবের প্রতি ভালোবাসা অর্পণ করেন। সেজদায় লুটিয়ে পড়ে রবের সঙ্গে হৃদয়ের কথা বলার এর চেয়ে উত্তম মাধ্যম আর কী হতে পারে? মনের জমে থাকা অব্যক্ত ভাষা যখন চোখের অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ে এবং সেই ভেজা হাতে রবের কাছে মিনতি জানানো হয়, তখনই যেন বান্দার জীবনে নেমে আসে পরম প্রশান্তি।
এ সময় মহান আল্লাহ পরম মমতায় বান্দার খুব কাছাকাছি চলে আসেন। এটা বান্দার জন্য এক সোনালি সুযোগ রবকে একান্ত কাছে পেয়ে নিজের সব প্রয়োজন ও মনের বাসনা তুলে ধরার। দুনিয়াবাসী যখন ঘুমের ঘোরে অচেতন থাকে, তখন আল্লাহর বিশেষ রহমত ও নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় নিজের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দেওয়া একজন মুমিনের জন্য বড় ধরনের ত্যাগের মহিমা। হাদিসের ভাষায়, ইবাদত যত কষ্টসাধ্য ও ত্যাগপূর্ণ হবে, তার প্রাপ্তিও হবে তত সুনিশ্চিত ও লাভজনক।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ নামাজ হলো রাতের নামাজ’ (সহিহ মুসলিম : ১১৬৩)। গুনাহ মাফ, রবের নৈকট্য লাভ এবং অন্তরকে কলুষমুক্ত রেখে মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম এই তাহাজ্জুদ। নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, ‘তোমাদের কিয়ামুল লাইল বা রাতের নামাজ আদায় করা উচিত। কারণ রাতে ইবাদত করা পূর্ববর্তী নেককার লোকদের রীতি। এটি প্রতিপালকের সান্নিধ্য লাভের পথ, গুনাহ মাফের উপায় এবং অপরাধ ও অশ্লীলতা থেকে বাঁচার ঢাল।’ (সহিহ ইবনে খুজাইমা : ১১৩৫)
পৃথিবীর প্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে মাটির ওপর। এই মাটিও মহান আল্লাহর হুকুমে কেয়ামতের দিন ধ্বংস হয়ে যাবে। দুনিয়ার দালানকোঠা সাময়িক সময়ের জন্য সুন্দর মনে হলেও আখেরাতের চিরস্থায়ী প্রাসাদের তুলনায় তা নগণ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাতের প্রাসাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, সেখান থেকে বাইরের সবকিছু এবং বাইরে থেকে ভেতরের সবকিছু দেখা যাবে। এক বেদুইন সাহাবি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এই প্রাসাদগুলো কাদের জন্য?’ তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘যারা মানুষের সঙ্গে নম্র কথা বলে, ক্ষুধার্তকে খাবার দেয়, নিয়মিত সিয়াম পালন করে এবং মানুষ যখন গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে তখন রাতে উঠে নামাজ আদায় করে।’ (সুনানে তিরমিজি : ২৫২৭)
আমরা মানুষ, ভুল আমাদের সহজাত। কিন্তু মহান দয়াময় আল্লাহ জানেন, আমরা অপরাধ করব; তাই তিনি ক্ষমার অপার সুযোগ করে দিয়েছেন। প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে তিনি নিকটবর্তী আসমানে নেমে আসেন এবং ঘোষণা করেন, ‘কে আছে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছে আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি তাকে তা দান করব? কে আছে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?’ (সহিহ বুখারি : ৬৩২১)।
একজন প্রকৃত মুমিন শেষ রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে না। তাহাজ্জুদকে সেতু বানিয়ে সেজদার বাহনে চড়ে সে পৌঁছে যায় মহান রবের দরবারে। আল্লাহর দরবারের চেয়ে উত্তম গন্তব্য মুমিনের জন্য আর কী হতে পারে? মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিয়মিত তাহাজ্জুদ গুজার হওয়ার তওফিক দান করুন।
শিক্ষক, জামিয়া রিয়াজুল উলূম, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
সময়ের আলো/আআ