বৃষ্টি প্রকৃতির এক চিরন্তন বিস্ময়, মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য রহমত। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেলে, বিদ্যুতের ঝলকানি আর মেঘের গর্জনের পর যখন প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়ে, তখন শুধু ধুলোমাখা পৃথিবীই সজীব হয়ে ওঠে না, জেগে ওঠে মানুষের হৃদয়ও। দীর্ঘ খরার পর বৃষ্টির স্পর্শে যেমন শুকিয়ে যাওয়া বৃক্ষ নতুন প্রাণ ফিরে পায়, তেমনি ক্লান্ত হৃদয়েও জাগে আশা, প্রশান্তি ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতি। ইসলামের দৃষ্টিতে বৃষ্টি কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি আল্লাহ তায়ালার অসীম রহমতের দৃশ্যমান প্রকাশ, তাঁর এক মহান কুদরতের নিদর্শন এবং মানুষকে চিন্তা, উপলব্ধি ও ঈমানের দিকে আহ্বান জানানোর এক অনন্য মাধ্যম।
পবিত্র কুরআনুল কারিমে বৃষ্টির প্রসঙ্গ অসংখ্যবার এসেছে। কোথাও তা রহমত, কোথাও জীবনের উৎস, কোথাও পুনরুত্থানের প্রমাণ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। একটি সাধারণ বৃষ্টিধারার মধ্যেও যে কত গভীর শিক্ষা লুকিয়ে আছে, কুরআন মানুষকে তা অনুধাবন করতে আহ্বান জানায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যিনি আসমান থেকে পরিমিত পরিমাণে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর আমি তা দ্বারা মৃত ভূমিকে সঞ্জীবিত করি। এভাবেই তোমাদেরও পুনরুত্থান ঘটানো হবে’ (সুরা যুখরুফ : ১১)।
এই আয়াতে বৃষ্টির সঙ্গে আখেরাতের এক গভীর সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘদিন অনুর্বর ও প্রাণহীন পড়ে থাকা জমি যখন কয়েক পশলা বৃষ্টির পর সবুজে আচ্ছাদিত হয়ে যায়, তখন তা মানুষের সামনে পুনরুত্থানের এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। যে মহান সত্তা মৃত মাটিকে পুনর্জীবিত করতে পারেন, তিনি নিশ্চয়ই কেয়ামতের দিন মৃত মানুষকেও পুনরুত্থিত
করতে সক্ষম। তাই প্রতিটি বর্ষণ মুমিনের জন্য আখেরাতের স্মরণও বটে।
কুরআন বৃষ্টিকে সরাসরি ‘রহমত’ বলে অভিহিত করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই তাঁর রহমতের পূর্বে সুসংবাদরূপে বায়ু প্রেরণ করেন। অতঃপর যখন তা ভারী মেঘ ধারণ করে, তখন কোনো নির্জীব ভূখণ্ডের দিকে আমি তা প্রেরণ করি। এরপর তা থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা দিয়ে সব ধরনের ফল উৎপন্ন করি। এভাবেই আমি মৃতদের জীবিত করে বের করব, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর’ (সুরা আরাফ : ৫৭)।
পবিত্র এই আয়াতে এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে প্রথমে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রবাহিত হয়, তারপর তা জলভরা মেঘ বহন করে, এরপর আল্লাহ সেই মেঘকে মৃত ও অনুর্বর ভূমির দিকে পরিচালিত করেন। অবশেষে বৃষ্টি বর্ষিত হলে সেই মৃত ভূমি সবুজে সেজে ওঠে এবং নানা প্রকার ফল-ফসল উৎপন্ন হয়। এই নিখুঁত ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষ যেন তার স্রষ্টার কুদরত, হেকমত ও রহমত উপলব্ধি করে। একই সঙ্গে আয়াতটি আরও গভীর একটি সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে যেভাবে বৃষ্টির মাধ্যমে মৃত জমিন পুনর্জীবিত হয়, ঠিক তেমনি কেয়ামতের দিন আল্লাহ মৃত মানুষদেরও পুনরুজ্জীবিত করবেন।
তাই বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা শুধু প্রকৃতির নবজাগরণের নয়, বরং আখেরাত ও পুনরুত্থানেরও এক জীবন্ত স্মারক। বৃষ্টি পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণের জীবনরেখা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি আকাশ থেকে পবিত্র পানি বর্ষণ করেছি, যাতে এর মাধ্যমে মৃত ভূখণ্ডকে সঞ্জীবিত করি এবং আমি যেসব জীবজন্তু ও মানুষ সৃষ্টি করেছি তার মধ্য থেকে অনেককে তা পান করাই’ (সুরা ফুরকান : ৪৯)
এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বৃষ্টির পানিকে পবিত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই পানি শুধু মানুষের তৃষ্ণাই নিবারণ করে না; ইসলামি শরিয়তে এই পানিই ওজু, গোসল ও পবিত্রতা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন, ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন, যাতে রয়েছে তোমাদের জন্য পানীয় এবং তা থেকে হয় উদ্ভিদ, যাতে তোমরা পশু চারণ করে থাকো। তার মাধ্যমে তিনি তোমাদের জন্য উৎপন্ন করেন শস্য, জাইতুন, খেজুর বৃক্ষ, আঙুর এবং ফল-ফলাদি। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্য রয়েছে নিদর্শন’ (সুরা নাহল : ১০-১১)।
একটি বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে মানুষের খাদ্য, কৃষি, অর্থনীতি, পশুপালন এবং সভ্যতার সম্পর্ক কত গভীর এই আয়াতগুলো তা অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরে। মানুষ যত আধুনিকই হোক, আকাশের বৃষ্টির বিকল্প আজও তৈরি করতে পারেনি। বৃষ্টির সেই সুনিপুণ ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা কেবল মহান আল্লাহরই সৃষ্টি। তাই প্রতিটি বর্ষণ মানুষকে নতুন করে শেখায় সব শক্তি, সামর্থ্য ও পরিকল্পনার ঊর্ধ্বে রয়েছেন একমাত্র আল্লাহ। তাঁর রহমত ছাড়া পৃথিবীতে জীবন টিকে থাকা অসম্ভব।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তারা নিরাশ হয়ে পড়লে তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন। আর তিনিই তো অভিভাবক, প্রশংসিত’ (সুরা শূরা : ২৮)। এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর অসীম ক্ষমতা, দয়া ও করুণার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। যখন দীর্ঘ অনাবৃষ্টির কারণে মানুষ, পশুপাখি ও কৃষিজমি চরম সংকটে পড়ে এবং সব আশা প্রায় শেষ হয়ে যায়, তখন আল্লাহই আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে জীবন ও আশার নতুন দ্বার উন্মুক্ত করেন। এখানে বৃষ্টিকে কেবল পানি হিসেবে নয়, বরং ‘রহমত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারণ এই বৃষ্টির মাধ্যমে জমি সজীব হয়, ফসল জন্মায়, পানির অভাব দূর হয় এবং মানুষের জীবন-জীবিকা সচল হয়ে ওঠে। আয়াতটি আরও একটি গভীর শিক্ষা দেয় যেমন আল্লাহ বাহ্যিকভাবে নিরাশার পরে বৃষ্টি দান করেন, তেমনি জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতির পরও তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য স্বস্তি ও কল্যাণের পথ খুলে দিতে সক্ষম।
তাই কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ নিজেকে অভিভাবক এবং সর্বপ্রশংসিত হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনিই তাঁর বান্দাদের প্রকৃত অভিভাবক, সব প্রয়োজন পূরণকারী এবং তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও নেয়ামত প্রশংসার যোগ্য।
বৃষ্টি হোক বা অন্য যেকোনো অনুগ্রহ- সবই তাঁর অসীম রহমতের প্রকাশ।
সময়ের আলো/আআ