বর্তমান সমাজে দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদের ঘটনা দিনদিন বেড়েই চলেছে। সংসারে অশান্তি যেনো নিত্যসঙ্গী। কিন্তু আমরা সকলেই সুখী দাম্পত্য জীবনের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু যে অভ্যাসগুলো আমাদের সেই সুখের সন্ধান দেবে, সেই অভ্যাসগুলো থেকে দূরে থাকি।
একটি সুখী দাম্পত্য জীবন গঠনের ভিত্তি কী জানেন? পারস্পরিক বোঝাপড়া, শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা আর সহমর্মিতা। স্বামী-স্ত্রী যদি একে অপরকে বোঝেন, সম্মান করেন এবং দায়িত্ব চাপিয়ে বা দিয়ে, ভাগাভাগি করে নেন, তাহলে সেই সংসারে অশান্তির জায়গা অনেকাংশে কমে আসে।
নবীজি (সা.) তার আদর্শ জীবন দিয়ে একটি সুন্দর দাম্পত্য জীবনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তিনি বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।'
স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম স্বামী হওয়ার কয়েকটি পদ্ধতি জেনে নেওয়া যাক—
একে অপরের সহযোগী হওয়া
রাষ্ট্র পরিচালনাসহ নানান দায়-দায়িত্ব পালন করার পরও নবীজি (সা.) স্ত্রীদের কাজে সহায়তা করতেন। হজরত আসওয়াদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, আমি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবীজি (সা.) যখন ঘরে থাকতে, তখন কী করতেন? জবাবে তিনি বললেন, ঘরের কাজকর্মে আমাদের সঙ্গে ব্যস্ত সময় পার করতেন। আর যখন নামাজের সময় হতো, তখন নামাজে চলে যেতেন। (বুখারি, হাদিস : ৬৭৬)।
স্ত্রীর প্রশংসা করা
কিছু ক্ষেত্রে কিছু মানুষের প্রশংসা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে ইসলাম। কারণ প্রশংসাই একমাত্র মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেয়। ইসলাম নিজ স্ত্রীদের প্রশংসা করার কথা বলা আছে। যেমনটা নবীজি (সা.) করে দেখিয়েছেন। আল্লাহর বন্ধু, মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, পুরুষের মধ্যে অনেকেই পূর্ণতা অর্জন করেছেন। কিন্তু নারীদের মধ্যে ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়া এবং ইমরানের কন্যা মারইয়াম ছাড়া আর কেউ পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়নি। তবে আয়েশার মর্যাদা সকল নারীর ওপর। যেমন সারীদের (গোশতের সুরুয়ায় ভিজা রুটির) মর্যাদা সকল ধরনের খাবারের ওপর। (বুখারি, হাদিস : ৩৪১১।)
স্ত্রীকে খাইয়ে দেওয়া
স্ত্রীকে খাইয়ে দেওয়া সুন্নত। তেমনিভাবে স্ত্রীর মুখের খাবার খাওয়াও সুন্নত। নবীজি (সা.) আয়শা (রা.)- এর খাওয়া খাবার খেয়েছেন।
মুসলিম শরিফের এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। ‘সর্বোত্তম সাদকা, স্ত্রীর মুখে এক লোকমা খাবার তুলে দেবে।’ হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবীজি (সা.) আমার কোলে মাথা রেখে কোরআন তিলাওয়াত করতেন। আর সপ সনয় আমি ঋতুস্রাব অবস্থায় ছিলাম। (বুখারি, হাদিস : ২৯৭।)
স্ত্রী-সন্তানকে সময় দেওয়া
স্ত্রীকে সময় দেওয়া। মানসিক সাপোর্ট দেওয়া আদর্শ স্বামীর কর্তব্য। স্ত্রী-সন্তানদের হক যথাযথভাবে আদায় করা। কথাবার্তা বলার সময় ভেবেচিন্তে বলা। সংযমী হওয়া। উকবা ইবনে আমের (রা.) বলেন, একদিন আমি নবীজি (সা.)-এর কাছে উভয় জাহানের মুক্তির পথ কী? সো বিষয়ে জানতে চাইলাম। নবীজি (সা.) জআাব দিলেন, কথাবার্তায় সংযমী হও, পরিবারের সঙ্গে তোমার অবস্থান যেন দীর্ঘ হয় এবং নিজের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হও। (তিরমিযি, হাদিস : ২৪০৬।)
ভালোবেসে সুন্দর নামে ডাকা
স্ত্রীকে ভালোবেসে সুন্দর নামে ডাকা সুন্নত। এতে পারস্পরিক ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধা বাড়ে। স্ত্রীকে সুন্দর ও ভালোবাসাপূর্ণ নামে ডাকা উত্তম। এতে দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুখ-শান্তি দৃঢ় হয়। নবীজি (সা.) তাঁর স্ত্রীদের বিভিন্ন সুন্দর নামে ডাকতেন, যেটা ছিল স্ত্রীদের প্রতি তার আগাত ভালোবাসার নিদর্শন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) কখনো কখনো আমার নাম হুমায়রা বা লাল গোলাপ বলে ডাকতেন। তিনি ভালোবেসে এই নামে ডাকতেন আমাকে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৭৪।)
স্ত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক
নবীজি (সা.)-এর পবিত্র দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীদের সঙ্গে আন্তরিকতা ও রোমান্টিকতার এত সব চিত্র রয়েছে, যা একটি আদর্শ দাম্পত্য জীবনের উৎকৃষ্ট উপমা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পরবর্তীতে উম্মুল মুমিনিনরা এসব ঘটনার বিবরণ এতটা আবেগ ও উচ্ছ্বাসের সঙ্গে দিয়েছেন, যা তাদের ভেতরকার ভাব-আবেগের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, পাত্রের যে অংশে আমি মুখ রেখে পানি পান করতাম, নবীজি (সা.) ঠিক সেই জায়গাটাই মুখ লাগিয়ে পানি পান করা পছন্দ করতেন। (মুসলিম, হাদিস : ৩০০।)
হজরত আয়েশা (রা.)-এর আরেক বর্ণনায় আছে, আমি হায়েজ (ঋতুবতী) অবস্থায় আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর মাথা আঁচড়ে দিতাম। (বুখারি, হদিস ২৯৫।)
স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া
নবীজি (সা.) স্ত্রীদের মধ্যে লটারি করতেন, যার নাম আসত তাকে নিয়ে ঘুরতে যেতেন, (বুখারি, হাদিস ২৫৯৩।)
এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি, ঘুরতপ যাওয়া মানে সময় অপচয় করা বয়। বরং এটাও একটা ইবাদত। নবীজি (সা.)-এর দেখানো পথ অনুসরণ করলে, জীবনের প্রতিটি কাজই ইবাদতে পরিনত হবে।
স্ত্রীকে চুমু দেওয়া
হজরত আয়েশা (রা.) এক হাদিসে বর্ণনা করেছেন, নবীজি (সা.) তাঁর এক স্ত্রীকে চুমা দিলেন, এরপর নামাজ আদায়ের জন্য বেরিয়ে গেলেন, কিন্তু ওজু করেননি। আমি (উরওয়াহ) বললাম, আপনেই সেই ব্যক্তি। এতে তিনি আয়েশা (রা.) হাসলেন। (ইবনে মাজাহ, হদিস : ৫০২।)
এই হাদিস আমাদের শেখায় ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। জীবনের সকল ক্ষত্রে ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে না চলা। স্ত্রীর সঙ্গে প্রেমময় সম্পর্ক তৈরি করা। তাকে সময় দেওয়া। দুনিয়ার এই প্রযুক্তি, সেই প্রযুক্তির পেছনে পরে পরিবারে অশান্তি ডেকে না আনা। একে একে অপরের মাঝো বোঝাপড়া আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হলে দাম্পত্য জীবনে আর কলহের সৃষ্টি হবে না। নবীজি (সা.)-এর দেখানো পথ অনুসরনেই রয়েছে সুখ-শান্তি।
সময়ের আলো/এসএকে