মৃত্যুর পর মানুষ দুনিয়ার জীবন ছেড়ে আলমে বারজাখে প্রবেশ করে। এরপর মৃত ব্যক্তি কবর থেকে জীবিতদের কথা শুনতে বা তাদের দেখতে পান কি না— ইসলামী আকিদা ও ফিকহের আলোচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু করে পরবর্তী যুগের আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
তবে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও আলেমের মতে, মৃতরা দুনিয়ার সবকিছু স্বাভাবিকভাবে শুনতে বা দেখতে পান না। কিন্তু কবরের কাছে এসে কেউ সালাম দিলে বা কথা বললে আল্লাহর ইচ্ছায় মৃত ব্যক্তি তা জানতে বা শুনতে পারেন।
মৃতদের শোনা ও দেখার বিষয়ে আলেমদের মত
১. অধিকাংশ আলেমের মত
জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে, বিশেষ করে কবরের পাশে এসে কেউ সালাম দিলে মৃত ব্যক্তি তা শুনতে পারেন এবং সালামদাতাকে চিনতেও পারেন।
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার সঙ্গীরা যখন ফিরে যায়, তখন মৃত ব্যক্তি তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায়।
(বুখারি: ১৩৭৪, মুসলিম: ২৮৭০)
বদরের যুদ্ধে নিহত মুশরিকদের একটি কূপে নিক্ষেপ করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের নাম ধরে সম্বোধন করেছিলেন। এ সময় সাহাবি হজরত ওমর (রা.) জানতে চান, যাদের প্রাণ নেই, তাদের সঙ্গে কেন কথা বলা হচ্ছে?
জবাবে রাসুল (সা.) জানান, তিনি যা বলছেন তা শোনার ক্ষেত্রে তারা জীবিত সাহাবিদের চেয়ে কম নয়; তবে তারা উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা রাখে না।
(বুখারি: ১৩৭০, মুসলিম: ২৮৭৩)
এ ছাড়া হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি বর্ণনায় এসেছে, কোনো ব্যক্তি দুনিয়াতে পরিচিত কোনো মৃত ব্যক্তির কবরের পাশ দিয়ে গিয়ে সালাম দিলে মৃত ব্যক্তি তাকে চিনতে পারে এবং তার সালামের জবাব দেয়।
(তাফসির ইবনে কাসির; কিতাবুর রুহ)
২. হজরত আয়েশা (রা.)-এর ভিন্ন মত
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.)সহ কিছু সাহাবি ও আলেমের মত হলো, মৃতরা সাধারণ নিয়মে জীবিতদের কথা শুনতে বা দেখতে পান না।
তারা কোরআনের আয়াতকে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন—
“নিশ্চয়ই আপনি মৃতদের শোনাতে পারবেন না।”
—সুরা আন-নামল: ৮০
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে—
“আপনি কবরে থাকা ব্যক্তিদের শোনাতে পারবেন না।”
—সুরা ফাতির: ২২
হজরত আয়েশা (রা.)-এর ব্যাখ্যা ছিল, বদরের ঘটনার ক্ষেত্রে নিহতদের শোনার বিষয়টি ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ মুজিজা। অর্থাৎ এটি সাধারণ নিয়ম নয়।
৩. সমন্বিত বা মধ্যমপন্থী ব্যাখ্যা
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যিমসহ কয়েকজন বিশিষ্ট আলেম উভয় ধরনের দলিলের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন।
তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির নিজস্ব ক্ষমতায় সবকিছু শোনা বা দেখার সামর্থ্য নেই। কোরআনের আয়াতগুলোর অর্থ হলো—জীবিত মানুষ নিজের ক্ষমতায় মৃতকে কিছু শোনাতে পারে না।
তবে আল্লাহ তাআলা চাইলে মৃত ব্যক্তিকে কোনো নির্দিষ্ট বিষয় শোনাতে বা জানাতে পারেন। বিশেষ করে কবরের কাছে গিয়ে সালাম দেওয়া হলে আল্লাহর ইচ্ছায় মৃত ব্যক্তি তা শুনতে পারেন।
অন্যদিকে, মৃত ব্যক্তি কবরে বসে দূর-দূরান্তের মানুষের সব কথা শুনতে পান বা দুনিয়ার সবকিছু দেখতে পান—এমন ধারণার নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।
কবর জিয়ারতের সময় সালাম
রাসুলুল্লাহ (সা.) কবর জিয়ারতের সময় কবরবাসীদের সালাম দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলতেন—
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ
উচ্চারণ:
‘আসসালামু আলাইকুম আহলাদ দিয়ারি মিনাল মুমিনিনা ওয়াল মুসলিমিনা।’
অর্থ:
‘হে মুমিন ও মুসলিম কবরবাসী! আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।’
(মুসলিম: ৯৭৫)
তাহলে সারকথা কী?
ইসলামী দৃষ্টিতে বারজাখের জীবন দুনিয়ার জীবনের মতো নয়। মৃত ব্যক্তিরা নিজেদের ক্ষমতায় দুনিয়ার সব কথা শুনতে বা সবকিছু দেখতে পান—এমনটি বলা ঠিক নয়। তবে আল্লাহ তাআলা চাইলে তাদের নির্দিষ্ট বিষয় শুনতে বা জানতে দিতে পারেন। কবরের পাশে গিয়ে সালাম ও দোয়া করার বিষয়টি হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে।
তাই মৃত স্বজনদের জন্য সবচেয়ে উত্তম কাজ হলো তাদের জন্য দোয়া করা, ইস্তিগফার করা, সদকা করা এবং কবর জিয়ারতের সময় সালাম দেওয়া। আল্লাহ তাআলা সকল প্রয়াত মুমিনকে ক্ষমা করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমিন।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ