জীবনের যেমন শুরু আছে, তেমনি আছে সমাপ্তি। পৃথিবীর মানুষদের শৈশব ও বার্ধক্য— দুটো রূপের সাক্ষী হতে হয়। শৈশবে কোনো করণীয় আমল না থাকলেও বার্ধক্যে রয়েছে কিছু আমল। যার জীবন যত দীর্ঘ হবে, তার আমলের সুযোগও তত বেশি মিলবে। এ জন্য হাদিসে দীর্ঘজীবী নেক আমলকারীকে শ্রেষ্ঠ মানুষ বলা হয়েছে। সে হিসেবে দীর্ঘায়ু আল্লাহ তায়ালার এক বিরাট নেয়ামত। নেক আমলের মাধ্যমে এ নেয়ামতের কদর করা উচিত।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘শ্রেষ্ঠ মানুষ সে-ই যার আয়ু দীর্ঘ হয় এবং কর্ম হয় উত্তম’ (তিরমিজি : ২৩২৯)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘বনু খুজায়া গোত্রের শাখা বনু বালির দুজন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাদের একজন শহিদ হয়ে যান। অপরজন আরও এক বছর জীবিত থাকেন। তারপর তিনিও মারা যান।
তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ (রা.) বলেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, যে ব্যক্তি পরে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি শহিদ ব্যক্তির আগে জান্নাতে প্রবেশ করেছেন। আমি অবাক হলাম। ভোরবেলা আমি বিষয়টা নবীজিকে (সা.) জানালাম। তিনি বললেন, এ ব্যক্তি কি শহিদ ব্যক্তির পর রোজা রাখেনি এবং এক বছর নামাজ পড়েনি?’ (মুসনাদে আহমদ : ১৩৮৯)
তবে বৃদ্ধ বয়সে ইবাদতে মশগুল থাকা জরুরি। সাধারণ এ বয়সে মেজাজ খিটখিটে থাকে। তাই সর্বদা ইবাদতে মশগুল থাকলে মনের অবস্থা পরিবর্তন করা সহজ। এ সময় বেশি বেশি তসবিহ-তাহলিল, দোয়া-দরুদ, ইসতিগফার পাঠ করতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো, খাঁটি তওবা। আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের সব পাপ মোচন করবেন এবং তোমাদের এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, নবী ও তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছে তাদের সেদিন আল্লাহ লাঞ্ছিত করবেন না। তাদের আলো তাদের সামনে ও ডানে ধাবিত হবে। তারা বলবে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন; নিশ্চয়ই আপনি সর্ববিষয়ে সর্বক্ষমতাবান।’ (সুরা তাহরিম : ৮)
হজরত মুসআব ইবনে সাদ ও আমর ইবনে মায়মূন হতে বর্ণিত, তারা বলেন, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) তার সন্তানদের নিম্নোক্ত বাক্যগুলো এমনভাবে শিক্ষা দিতেন, যেমনভাবে মক্তবে শিক্ষক শিশুদের শিক্ষা দেন। আর তিনি বলতেন, রাসুল (সা.) নামাজের পর এগুলো দ্বারা আল্লাহ তায়ালার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন— ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিনাল জুবনি, ওয়া আউজু বিকা মিনাল বুখলি, ওয়া আউজু বিকা মিন আরজালির উমুরি, ওয়া আউজু বিকা মিন ফিতনাতিদ দুনিয়া, ওয়া আজাবিল কাবরি’। অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ! তোমার কাছে আমি ভীরুতা হতে আশ্রয় চাই, তোমার কাছে কৃপণতা হতে আশ্রয় চাই, তোমার কাছে অতি বার্ধক্যে পৌঁছার বয়স হতে আশ্রয় চাই এবং তোমার কাছে দুনিয়ার ঝগড়া-বিবাদ ও কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই।’ (বুখারি, হাদিস : ২৮২২)
এ ছাড়া বৃদ্ধ ও প্রবীণদের কর্তব্য হলো— ‘আত্মীয়স্বজনদের যথাসম্ভব খোঁজখবর নেওয়া ও দোয়া করা। যেমন ইবরাহিম (আ.) বৃদ্ধ অবস্থায় তার ছেলে ইসমাঈলের (আ.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। এক সঙ্গে কাবাঘর নির্মাণ করেন এবং তাদের জন্য ও পরবর্তী বংশধরের জন্য দোয়া করেন’ (বুখারি, হাদিস : ৩৩৬৪)। এ ছাড়া যথাসম্ভব কুরআন তেলাওয়াত করা বা শ্রবণ করা, বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করা ইত্যাদি। এতে করে প্রবীণের মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক বৃদ্ধি পায়।
আমাদেরও প্রত্যেককে প্রবীণদের অধিকার ও মর্যাদা এবং তাদের প্রতি করণীয় সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের বৃদ্ধ ও প্রবীণদের যথাযথভাবে সম্মান করার এবং তাদের অধিকার প্রদানের মাধ্যমে জান্নাতবাসী হওয়ার তওফিক দান করুন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে