মানবজীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে প্রয়োজন এক নির্ভুল নির্দেশনার, যা মানুষকে পথ দেখাবে অন্ধকারে, জোগাবে এগিয়ে চলার প্রেরণা। পৃথিবীতে যুগে যুগে বহু মনীষীর আগমন ঘটেছে, কিন্তু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনচরিত বা সিরাত পুরো মানবজাতির জন্য এক অনন্য ও কালজয়ী আলোকবর্তিকা। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আজ মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
অথচ একটি সুন্দর, পরিশীলিত ও মানবিক সমাজ গঠনে সিরাত পাঠ কেবল প্রয়োজনীয়ই নয়, বরং অপরিহার্য। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমার অনুসরণ করো; তা হলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৩১)।
সিরাত অধ্যয়ন কেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হওয়া উচিত, তার যৌক্তিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মানবজীবনের প্রতিটি স্তরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। সিরাত পাঠের ফজিলতগুলো হলো- বাহ্যিক পরিপাট্য ও অন্তর্জগতের আলো মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় রূপের সমন্বয়ে। সিরাত আমাদের শেখায় কীভাবে পরিপাটি ও রুচিশীল জীবনযাপন করতে হয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২৩)। তার পোশাক পরিধান, সুগন্ধি ব্যবহার এবং পরিপাটি থাকার সুন্নাহ আমাদের বাইরের পরিপাট্য নিশ্চিত করে। অন্যদিকে কেবল বাহ্যিক চাকচিক্যই নয়, সিরাত আমাদের অন্তর্জগৎকে আলোকিত করার পথ দেখায়।
যেমনটি রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ওপর যে জিনিসটিকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা হলো ছোট শিরক বা রিয়া’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৬৩০)। অহংকার, হিংসা, লোভ ও রিয়া তথা লৌকিকতা থেকে মুক্ত হয়ে কীভাবে একটি প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী হওয়া যায়, সিরাত পাঠে সেই আধ্যাত্মিক মহিমার স্ফুরণ ঘটে।
শিষ্টতাপূর্ণ আচরণ ও ভাষার মাধুর্য
বর্তমান সমাজে সবচেয়ে বড় সংকট হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও শিষ্টাচারের অভাব। সিরাত পাঠ আমাদের আচার-আচরণকে করে তোলে বিনয়ী ও শিষ্টতাপূর্ণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ছোটদের স্নেহ করো, বড়দের সম্মান করো’ (সুনানুত তিরমিজি, হাদিস : ১৯১৯)। এ সংস্কৃতি একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি। এর পাশাপাশি তিনি ছিলেন বিশুদ্ধভাষী ও সদালাপী।
তাঁর প্রতিটি কথা ছিল স্পষ্ট, অর্থবহ এবং মাধুর্যে ভরপুর। কখনো কারও সঙ্গে কর্কশ ভাষায় কথা বলেননি। তাঁর মাঝে ছিল সত্যবাদিতা, সাহসিকতা, কোমলতা, দৃঢ়তা, বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতা, সহানুভূতি-সহমর্মিতা, কল্যাণকামিতা, বদান্যতা, ধৈর্য-সহিষ্ণুতা, স্নেহ-মমতা, পরমতসহিষ্ণুতা, আত্মসচেতনতা, আল্লাহর প্রতি পরম আস্থা, আপন কাজে নিষ্ঠা ও অবিচলতা, ন্যায়ের প্রতি আনুকূল্য, অন্যায়ের প্রতি বজ্র-কাঠিন্য, অটুট মনোবল, নিঃস্বার্থ ত্যাগ-তিতিক্ষা। মোদ্দাকথা, উন্নত চরিত্রের সব উপাদান তাঁর মধ্যে ছিল।
এ ছাড়া মজলিসে কীভাবে বসতে হবে, আগন্তুককে কীভাবে বিদায় জানাতে হয়, আগন্তুককে কীভাবে সম্বোধন করতে হবে, অতিথিকে কীভাবে বিদায় জানাতে হয়, পথচারী আপনার কাছে কী ব্যবহার চায়, সাথি-সঙ্গী ও ছোট-বড়ভেদে আচরণের কী তারতম্য হওয়া দরকার, ইশারা-ইঙ্গিতের প্রয়োগ কেমন হওয়া চাই, প্রশ্ন ও উত্তরের ধরন কেমন হওয়া বাঞ্ছনীয় ইত্যাদি বিষয়ে সঠিক ধারণা লাভের জন্য আমাদের অবশ্যই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীগ্রন্থ পাঠ করতে হবে।
চরিত্রের ভারসাম্য ও পেশাগত উৎকর্ষ
মানব চরিত্রের এক বিস্ময়কর দিক হলো ভারসাম্য, যা ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন। সিরাত আমাদের চরিত্রের ভারসাম্য সৃষ্টিতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। রাগ-অনুরাগ, হাসি-কান্না, কঠোরতা-কোমলতা সবকিছুর এক অপূর্ব সমন্বয় ছিল রাসুল (সা.)-এর জীবনে।
তিনি যেমন ছিলেন রণক্লান্ত সেনাপতি, তেমনি ছিলেন শিশুদের সঙ্গে খুনশুটিতে মেতে ওঠা এক মমতাময়ী পিতা। ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, সময়ানুবর্তিতা এবং সহকর্মীদের প্রতি সুবিচার পেশাগত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা যেকোনো যুগের যেকোনো পেশাজীবীর জন্য এক চূড়ান্ত গাইডলাইন। তাঁর সান্নিধ্যে যারা এসেছেন, তাদেরও সুন্দর ও বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর ভাষা হতো সুস্পষ্ট, বাহুল্যবর্জিত ও সহজবোধ্য। তাঁর মধুর ভাষণ শ্রোতাকে মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করত। চরম বিদ্বিষ্ট ব্যক্তি পর্যন্ত তাঁর বচন শুনে চমৎকৃত হতো।
ভাষার রুঢ়তা তিনি পছন্দ করতেন না। গালমন্দ ও অশ্লীলতা তাঁর ভাষায় ঠাঁই পেত না। একদিকে তাঁর স্নিগ্ধ ভাষা হতদরিদ্র বেদুইন বৃদ্ধার হৃদয় সঞ্জীবিত করত, অন্যদিকে তার শানিত বাক্যে দুর্দান্ত আরব্য সর্দারের অন্তরাত্মা প্রকম্পিত হতো।
মহানবী (সা.)-এর জীবনচরিতের এ অধ্যায় নিঃসন্দেহে তাঁর আগ্রহী পাঠককে উন্নত ও মহৎ চরিত্রের পথনির্দেশ করে এবং কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে তার অনুশীলনে অনুপ্রাণিত করে। সুতরাং নিজের ভেতর উন্নত চরিত্রের বিকাশ সাধনের লক্ষ্যে প্রতিটি মানুষের জন্য সিরাত পাঠের বিকল্প নেই।
শোক ও দুঃখে পরম সান্ত্বনা
মানুষের জীবনে শোক ও দুঃখ এক অনিবার্য বাস্তবতা। প্রিয়জন হারানো বা জাগতিক ব্যর্থতায় যখন মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়ে, তখন সিরাত পাঠ হতে পারে সবচেয়ে বড় মানসিক প্রলেপ। রাসুল (সা.) তাঁর জীবনে পিতা-মাতা, প্রিয়তমা স্ত্রী, সন্তান এবং অসংখ্য প্রিয় সাহাবিকে হারিয়েছেন।
অবর্ণনীয় শোকের মুহূর্তেও তিনি কীভাবে ধৈর্যধারণ করেছেন এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থেকেছেন, তা শোকে-দুঃখে মুহ্যমান যেকোনো মানুষের জন্য পরম সান্ত্বনা ও ঘুরে দাঁড়ানোর পাথেয় হিসেবে কাজ করে। আল্লাহ তায়ালার প্রিয় হাবিবকে যখন দুঃখ পোহাতে হয়েছে, তখন আপনাকে আমাকেও পোহাতে হবে বৈকি। এটা আমাদের পক্ষে সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা। কুরআন মাজিদের ভাষায়, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তার জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব : ২১)।
সিরাত কোনো সাধারণ ঐতিহাসিক গ্রন্থ নয়, এটি জীবনের এক জীবন্ত ক্যানভাস। আমাদের ব্যক্তিসত্তার উন্নয়ন, পারিবারিক প্রশান্তি এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা সবকিছুর নিখুঁত সমাধান লুকিয়ে আছে এই পবিত্র জীবনচরিতে। আসুন, আমরা সিরাত পড়ি, অনুধাবন করি এবং ব্যক্তিজীবনে তার প্রতিফলন ঘটাই। কারণ আলোকিত জীবন ও একটি মানবিক বিশ্ব গড়তে সিরাতের চেয়ে বড় কোনো পাঠ্যসূচি এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।
লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি